শিশুর নিরাপদ হাসির চেয়ে বড় কোনো উন্নয়ন হতে পারে না”

শিশুর নিরাপদ হাসির চেয়ে বড় কোনো উন্নয়ন হতে পারে না”
//মো: আশরাফুল আলম//
রাত তখন প্রায় সাড়ে বারোটা। শহরের একটি হাসপাতালের করিডোরে বসে কাঁদছিলেন এক মা। তাঁর সাত বছরের মেয়েটি আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। পাশেই কয়েকজন তরুণ মোমবাতি হাতে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে, সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিচ্ছে— “উই ওয়ান্ট জাস্টিস!”পরদিন সংবাদপত্রে খবর ছাপা হলো, টেলিভিশনে টকশো বসল, ফেসবুকে ঝড় উঠল। তারপর?আর দশটা ঘটনার মতো এটিও ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল মানুষের স্মৃতি থেকে। কিন্তু সেই শিশুটির মায়ের কান্না আজও থামেনি।
আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে কন্যাশিশুর নিরাপত্তা এখন আর কেবল পারিবারিক উদ্বেগ নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। প্রতিদিন সংবাদপত্র খুললেই শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন কিংবা হত্যার খবর চোখে পড়ে। কোনো শিশু স্কুলে নিরাপদ নয়, কোনো শিশু বাসায় নিরাপদ নয়, এমনকি আত্মীয়তার বন্ধনও আজ অনেক ক্ষেত্রে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের এক প্রতিবেদন বলছে, গত কয়েক বছরে শিশু নির্যাতনের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অথচ আমাদের দেশে আইন কম নেই। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, শিশু আইন, সাইবার নিরাপত্তা আইন—সবই আছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, কেন অপরাধ কমছে না?সমস্যা আসলে আইনের বইয়ে নয়, সমস্যাটা বাস্তব প্রয়োগে।একটি নির্যাতনের ঘটনার পর ভুক্তভোগী পরিবারকে প্রথমেই যেতে হয় থানায়। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে অভিযোগ নিতে গড়িমসি করা হয়। কোথাও প্রভাবশালীদের ফোন আসে, কোথাও আপসের চাপ আসে। তারপর শুরু হয় তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা। মেডিকেল রিপোর্ট, ডিএনএ পরীক্ষা, ফরেনসিক বিশ্লেষণ—সবকিছু মিলিয়ে মাসের পর মাস কেটে যায়। এই সময়ের মধ্যে অপরাধীরা জামিনে বেরিয়ে এসে পরিবারকে ভয়ভীতি দেখায়।কুমিল্লার তনু হত্যা মামলার কথা এখনো মানুষের মনে আছে। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও সেই হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ সত্য আজও স্পষ্ট হয়নি। অন্যদিকে ফেনীর নুসরাত জাহান রাফি হত্যার বিচার দ্রুত হওয়ায় মানুষ কিছুটা আশার আলো দেখেছিল। অর্থাৎ রাষ্ট্র চাইলে দ্রুত বিচার সম্ভব, কিন্তু সেই সদিচ্ছা সব ক্ষেত্রে সমানভাবে দেখা যায় না।তবে কেবল বিচার ব্যবস্থাকে দায়ী করলেই চলবে না। আমাদের সমাজের ভেতরেও ভয়ংকর এক অসুস্থতা বাসা বেঁধেছে।একটি ছেলে শিশু যখন ছোটবেলা থেকেই দেখে—বাবা সিদ্ধান্ত নেয়, মা শুধু মানিয়ে নেয়; ছেলে বাইরে খেলবে, মেয়ে ঘরের কাজ করবে; ছেলের ভুলকে “দুষ্টুমি” বলা হবে, মেয়ের প্রতিবাদকে “বেয়াদবি” বলা হবে—তখন তার মনোজগতে অজান্তেই জন্ম নেয় আধিপত্যের বীজ।এই কারণেই নারীর প্রতি সহিংসতা কেবল অপরাধ নয়, এটি একটি সামাজিক শিক্ষা।আর সেই শিক্ষা বদলাতে হবে পরিবার থেকেই।জাপানে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়—নিজের কাজ নিজে করা এবং অন্যকে সম্মান করা। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে স্কুলের পাঠ্যসূচিতে ‘জেন্ডার রেসপেক্ট’ বাধ্যতামূলক। দক্ষিণ আফ্রিকার ‘থুথুজেলা কেয়ার সেন্টার’-এ নির্যাতিত শিশু একই জায়গায় চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও আইনি সহায়তা পায়। ফলে শিশুটিকে বারবার ট্রমার মুখোমুখি হতে হয় না।আমরা কি পারি না এমন উদ্যোগ নিতে?আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো মূলত পরীক্ষার ফলাফল নিয়েই ব্যস্ত। অথচ একটি শিশুকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্বও স্কুলের। ক্লাসে যদি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্মতি, মানবিকতা ও সহমর্মিতার ব্যবহারিক শিক্ষা দেওয়া হতো, তাহলে হয়তো আগামী প্রজন্ম আরও সচেতন হয়ে উঠত।ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।জুমার খুতবা, ওয়াজ মাহফিল কিংবা ধর্মীয় আলোচনায় যদি নিয়মিতভাবে শিশু সুরক্ষা ও নারীর মর্যাদার কথা বলা হতো, তাহলে সমাজে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়ত। কারণ এদেশের মানুষ ধর্মীয় বক্তব্যকে গভীরভাবে গুরুত্ব দেয়।একইসঙ্গে আমাদের মিডিয়াকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। অনেক সময় গণমাধ্যম কেবল ঘটনার ভয়াবহতা দেখিয়ে সাময়িক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। কিন্তু মামলার অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন খুব কমই দেখা যায়। অথচ ধারাবাহিক ফলো-আপ সাংবাদিকতা প্রশাসনের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।সুশীল সমাজের ভূমিকাও এখন নতুনভাবে ভাবতে হবে। কেবল মানববন্ধন আর প্রতিবাদ সমাবেশ যথেষ্ট নয়। প্রতিটি জেলায় নাগরিক পর্যবেক্ষণ টিম গঠন করা যেতে পারে, যারা শিশু নির্যাতনের মামলাগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি সহায়তা দেবে।ভারতে ২০১২ সালের নির্ভয়া ঘটনার পর দেশজুড়ে যে নাগরিক আন্দোলন হয়েছিল, সেটি সরকারকে আইন পরিবর্তনে বাধ্য করেছিল। অর্থাৎ জনচাপ কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারে—যদি সেই চাপ ধারাবাহিক ও সংগঠিত হয়।আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি শিশুর কান্না কেবল একটি পরিবারের কান্না নয়; সেটি পুরো রাষ্ট্রের ব্যর্থতার আর্তনাদ।আজ যে কন্যাশিশুটি নিরাপত্তাহীনতায় বড় হচ্ছে, আগামীকাল সেই ভয় নিয়েই সে সমাজ গড়বে। ফলে এই সংকট কোনো একক পরিবারের নয়, এটি আমাদের জাতীয় সংকট।তাই এখন আর কেবল মোমবাতির আলোয় প্রতিবাদ দেখানোর সময় নয়।এখন সময়—আইনের দ্রুত প্রয়োগ নিশ্চিত করার,পরিবারে মানবিক শিক্ষা ফিরিয়ে আনার,স্কুলে মূল্যবোধ শেখানোর,এবং সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার ভিত ভেঙে নতুন এক মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার।কারণ একটি শিশুর নিরাপদ হাসির চেয়ে বড় উন্নয়ন কোনো রাষ্ট্রের জন্য হতে পারে না।
