আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে চান? - বিস্তারিত
  • শুক্রবার, ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২২শে মে, ২০২৬ ইং, ৩রা জিলহজ্জ, ১৪৪৭ হিজরী
সর্বশেষঃ

রামিসা ট্রাজেডি

সামাজিক অবক্ষয়ের আয়নায় আর কতকাল মুখ লুকাবে রাষ্ট্র?
//মো: আশরাফুল আলম //
​গত কয়েকদিন ধরে একটি নাম আমাদের বিবেককে প্রতিনিয়ত দংশন করে চলেছে—রামিসা। একটি নিষ্পাপ প্রাণ, একটি পরিবারের বুকভরা আশা আর স্বপ্নের অকালপ্রয়াণ কেবল একটি পরিবারের বিপর্যয় নয়; বরং এটি আমাদের চেনা সমাজ, চেনা রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরের কদর্য রূপটাকে আবারও নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে। রামিসার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং এটি আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং ক্রমান্বয়ে তলিয়ে যাওয়া সামাজিক নৈতিকতার এক ভয়াবহ স্মারক।
​একটি স্বাধীন, সভ্য রাষ্ট্রে একজন নাগরিকের সবচেয়ে মৌলিক অধিকার হলো তার জীবনের নিরাপত্তা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আজ আমাদের ঘরের কন্যারা, আমাদের মা-বোনেরা ঘরে কিংবা বাইরে—কোথাও নিরাপদ বোধ করতে পারছে না। যে সমাজ বা রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি নিরাপদ পরিবেশ দিতে পারে না, তার অন্য সব বাহ্যিক উন্নয়ন ও মেগা প্রজেক্টের জৌলুস যে কতটা ফাঁকা ও অর্থহীন, রামিসা ট্র্যাজেডি তা আমাদের আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। মানুষ যখন নিজের দেশে, নিজের চেনা পরিবেশে সুরক্ষিত বোধ করে না, তখন সামগ্রিক উন্নয়ন কেবলই এক নির্মম পরিহাসে পরিণত হয়।আমাদের দেশের অপরাধের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি চেনা ছক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোনো একটি নির্মম ঘটনা ঘটার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, মিডিয়ায় তোলপাড় হয়, প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়ে যায়। কিন্তু দিন যত গড়ায়, মামলার গতি তত মন্থর হয়। আইনি ফাঁকফোকর, প্রভাবশালীদের চাপ কিংবা প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে আটকে পড়ে বিচারপ্রক্রিয়া। ভুক্তভোগী পরিবারকে তখন বিচারের দাবিতে আদালতপাড়া থেকে শুরু করে রাজপথে চোখের জল ফেলতে হয়। এই যে বিচার পাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি যন্ত্রণা, এটাই অপরাধীদের আরও দুঃসাহসী করে তোলে। তারা অবলীলায় বিশ্বাস করতে শুরু করে যে—অপরাধ করলেও পার পাওয়া সম্ভব। রামিসার ক্ষেত্রেও যদি একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে তা হবে এই সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য চরম লজ্জাজনক।আমরা আর কোনো গৎবাঁধা আশ্বাস বা তদন্ত কমিটির দীর্ঘমেয়াদি রিপোর্টের অপেক্ষায় বসে থাকতে পারি না। এখন সময় এসেছে রাষ্ট্রকে তার অভিভাবকের ভূমিকা প্রমাণ করার। রামিসা হত্যার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাকে আইনের সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক অনুকম্পা যেন এই বিচারকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সরকারকে তা কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
​একই সাথে, আমাদের শুধু আইনের ওপর ভরসা করে বসে থাকলে চলবে না। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সর্বস্তরে নৈতিক শিক্ষার পুনর্জাগরণ ঘটাতে হবে। অপরাধীকে সামাজিকভাবে বয়কট করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। আজ যদি আমরা রামিসার পক্ষে শক্ত হয়ে না দাঁড়াই, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে না তুলি, তবে কাল এই অন্ধকারের গ্রাসে হারিয়ে যাবে অন্য কোনো রামিসা।
​আমরা রামিসা হত্যার দ্রুততম বিচার চাই। রাষ্ট্র যেন তার নাগরিকদের সুরক্ষার আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব সার্থকভাবে পালন করে—এটাই আজকের দিনে এ দেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষের একমাত্র দাবি।

ফেসবুকে লাইক দিন