আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে চান? - বিস্তারিত
  • রবিবার, ২৮শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১২ই জুলাই, ২০২৬ ইং, ২৬শে মুহাররম, ১৪৪৮ হিজরী
সর্বশেষঃ

শৈশবের আচাবারি: ধুলধুল খেলার মধুময় দিন- মহিউদ্দিন মহিন

নিউজ ডেস্ক: সত্তর দশকে জন্ম নিলেও, হাটি হাটি পা পা করে যখন হাঁটতে শিখেছি, তখন পৃথিবীটা ছিল আমার কাছে এক বিশাল খেলার মাঠ। বাড়ির আঙিনা, ঘরের বারান্দা, এ ঘর-ও ঘরের ছেলেমেয়েরা—সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছিল এক আপন ভুবন। সেই শৈশবের দিনগুলো আজও আমি খুঁজে ফিরি স্মৃতির অলিগলিতে। যতটুকু মনে পড়ে, যতটুকু স্মৃতিগোচর হয়, ততটুকুই লিখে রাখি—আমার শৈশবের সমবয়সী ও অসমবয়সী বন্ধুদের কথা, আমাদের নির্ভেজাল আনন্দের গল্প। শৈশবে আমরা প্রায়ই চড়ুইভাতি খেলতাম। কোমল হাতের স্পর্শে, শিশুসুলভ হাসি আর কোলাহলে হারিয়ে যেতাম আনন্দ-উল্লাসের এক স্বপ্নিল জগতে। আমাদের সেই চড়ুইভাতির সাথীরা ছিল—তরিকুল ইসলাম, মোঃ হারেছ, ইসমাইল ভাই, আবুল কালাম, জাহানারা বেগম, শায়েরা খাতুন, শাহানুর বেগম, কহিনুর বেগম, শাহাবুদ্দিন, মানিক, ইলিয়াছ, রহিমা বেগম, নুরজাহান,আব্দুর রব, নিজাম —নামগুলো আজও মনে পড়লেই বুকের ভেতর কেমন এক মায়া জমে ওঠে।
ভোলা জেলার আঞ্চলিক ভাষায় এই চড়ুইভাতির খেলাকেই বলা হতো “আচাবারি খেলা”। কখনো আবার আমরা একে ডাকতাম “ধুলধুল খেলা” নামে। এই খেলায় আমাদের প্রধান উপকরণ ছিল নারিকেলের মালা, যাকে আমরা আঞ্চলিক ভাষায় বলতাম “আচা”। নারিকেলের আচাই হয়ে উঠত আমাদের রান্নার ডেক-ডেকচি, আর চাল-ডাল হিসেবে ব্যবহার করতাম ধুলাবালি। আমাদের বাড়ির দক্ষিণ পাশে ছিল একটি সুন্দর চৌকা পুকুর। পুকুরের চারপাশে সারি সারি নারিকেল গাছ, চার পাড়ই ছিল একটু উঁচু। বর্ষাকালেও পানি উঠে পুকুর পাড় ডুবিয়ে দিতে পারত না। সেই পাড়গুলো ছিল প্রশস্ত, যেন বাড়ির উঠোনেরই আরেক রূপ। দিনভর আমরা সেখানে অবাধে খেলাধুলা করতাম—হাসি, দৌড়ঝাঁপ আর কোলাহলে মুখরিত থাকত পুরো পরিবেশ। পুকুরপাড়ের নরম মাটি একটু খুঁড়ে আমরা বানাতাম ছোট্ট চুলা, যাকে ভোলা জেলার আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয় “পাহা”। সেই পাহার ওপর বসানো হতো নারিকেলের বড় একটি আচা—ভাতের হাঁড়ি হিসেবে। ভেতরে শুকনো ধুলাবালি ঢুকিয়ে বানানো হতো ভাত। পাশেই বসত আরেকটি ছোট আচা, সেটি তরকারির ডেকচি। তাতে সামান্য জল ঢেলে দেওয়া হতো, আর তার সঙ্গে যোগ হতো বুনো শাক-সবজি, বুনো গোটা, বুনো ফুল—প্রকৃতির কোলে পাওয়া যা কিছু।
ভোলা জেলার আঞ্চলিক ভাষায় রান্নার পাত্রকে বলা হয় “ডেক”, আর তরকারির পাত্রকে “ডেকচি”। চুলার ভেতরে গুঁজে দিতাম ছোট ছোট শুকনো লাকড়ি। অনেক সময় সত্যিকারের আগুনও ধরাতাম। দিয়াশলাইকে আমরা বলতাম “ম্যাচবাতি”। একটি কাঠি হাতে নিয়ে খুন্তির মতো নেড়েচেড়ে দেখতাম রান্না হয়েছে কি না। খুন্তিকে বলা হতো “তালাশী”। কোনো গাছের টুকরো বা ভাঙা মাটির হাঁড়ি দিয়ে বানিয়ে নিতাম চামচ—যার নাম ছিল “টগ্গী”। এই রান্নাবান্নার কাজগুলো অধিকাংশ সময় করত আমাদের মেয়ে খেলার সাথীরা। আমরা ছেলেরা তখন আশপাশে মেতে থাকতাম নানান খেলায়—কুতকুত খেলা, হাতের ওপর হাত রেখে চিমটি কাটার খেলা, এক্কাদোক্কা, গুটি খেলা, চারা-চারা খেলা, চোর-ডাকাত, চোর-পালান্তি—শৈশব যেন ছিল খেলায় ভরা এক অনন্ত উৎসব। রান্না শেষ হলে শুরু হতো খাওয়া-দাওয়ার পর্ব। কলাপাতার ডগা দিয়ে বানানো প্লেট হাতে নিয়ে সবাই গোল হয়ে বসে পড়তাম। টগ্গী দিয়ে এক-দুই টগ্গী করে কলাপাতায় ঢেলে দেওয়া হতো ধুলাবালি দিয়ে তৈরি ভাত আর বুনো শাক-সবজির তরকারি। হাত দিয়ে ভাত নাড়াচাড়া করে খাওয়ার অভিনয় করতাম। তৃপ্তির ঢেকুর তুলতাম, যেন সত্যিই পেটভরে খেয়ে ফেলেছি। শৈশবের সেই আচাবারি, সেই ধুলধুল খেলা আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মনে হয়, সময়ের স্রোত পেরিয়ে আমি আবার ফিরে গেছি সেই পুকুরপাড়ে, সেই মাটির চুলার পাশে। মাঝে মাঝে নিজের মনকেই ছোট্ট শিশু বানিয়ে ফেলি। কল্পনার ডানায় ভর করে হারিয়ে যাই শৈশবের বন্ধুদের সঙ্গে—মধুময় স্মৃতির আচাবারি খেলায়। এই স্মৃতিগুলোই আমার শৈশব, আমার শেকড়, আমার অস্তিত্বের নীরব সাক্ষী।

ফেসবুকে লাইক দিন