আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে চান? - বিস্তারিত
  • বুধবার, ১১ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৬শে আগস্ট, ২০২৬ ইং, ১২ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরী
সর্বশেষঃ

আলেয়ার আলো—রহস্য, ভয়, বিস্ময় ও স্মৃতির শৈশব ( ১৯৮ অধ্যায়)— মহিউদ্দিন মহিন

মহিউদ্দিন মহিন: শৈশব মানুষের জীবনে এক চিরকালীন রহস্যময় অধ্যায়—যেখানে বাস্তবতা ধীরে ধীরে কল্পনার রঙে রঞ্জিত হয়ে ওঠে,
আর কল্পনা আবার বাস্তবের চেয়েও অধিক সত্য বলে অনুভূত হয়।
সেই সময়ে পৃথিবী কেবল চোখে দেখা কোনো ভৌগোলিক বাস্তবতা নয়, বরং হৃদয়ের গভীর অনুভবের এক বিস্তীর্ণ জগৎ।
প্রতিটি শব্দ তখন গল্প হয়ে ওঠে, প্রতিটি নীরবতা হয়ে যায় এক অদৃশ্য উচ্চারণ, আর প্রতিটি অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে অজানা কোনো কাহিনির সূচনা।
আমাদের সেই দুরন্ত, ধুলোমাখা, হাসি-কান্নায় ভরা শৈশবেও তেমনি এক অদ্ভুত বিস্ময়, এক রহস্যময় আতঙ্ক, এক অপার্থিব কৌতূহলের নাম ছিল—“আলেয়ার আলো”।
গ্রামবাংলার জনপদে এই নামটি উচ্চারিত হলেই যেন বাতাসে এক ধরনের গম্ভীরতা নেমে আসত।
বড়দের চোখে দেখা যেত অদ্ভুত সতর্কতার ছায়া, কণ্ঠস্বরে মিশে থাকত যুগের পর যুগ বহমান এক অজানা অভিজ্ঞতার ভার।
কেউ বলতেন, এটি পথভোলা আত্মার দীর্ঘশ্বাস; কেউ বলতেন, এটি বিলের গভীরে ঘুমিয়ে থাকা অশরীরী শক্তির নিঃশব্দ নিঃশ্বাস; আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করতেন, এটি রাতের অন্ধকারে ঘুরে বেড়ানো অদৃশ্য আত্মাদের মায়াবী সংকেত।
আমাদের গ্রামের মানুষ বলতেন আমাদের ভাষায় এটি এক জাতের ভূত: আলো দিয়ে পোকামাকড় ধরে খায়, একা পেলে কারো ঘাড় মটকিয়ে দেয় হত্যা করে ।
আমরা তখন ছোট, আমাদের যুক্তি ছিল সীমিত, কিন্তু কল্পনার আকাশ ছিল অসীম।
তাই প্রতিটি গল্প আমাদের মনে একেকটি জীবন্ত দৃশ্যপট আঁকত—যেন অন্ধকার নিজেই কথা বলছে, আর রাত নিজেই কোনো প্রাচীন উপকথা শোনাচ্ছে।
ঘরের কাঁচা দেয়াল, খড়ের ছাউনি, উঠানের মাটির গন্ধ, দূরের পুকুরের জলের শব্দ—সবকিছুই তখন একেকটি রহস্যময় সত্তার মতো মনে হতো।
রাত নামলেই আমাদের পৃথিবী বদলে যেত; পরিচিত গ্রাম হয়ে উঠত এক অচেনা জগত, যেখানে বাস্তব আর কল্পনার সীমারেখা মুছে যেত।
আমাদের গঙ্গাকীর্তি, দড়িরাম শংকর গ্রাম ছিল প্রকৃতির এক নিঃশব্দ কবিতা—যেখানে ধানক্ষেতের সবুজ ঢেউ বাতাসে দুলে দুলে যেন কোনো অদৃশ্য সংগীত বাজাত।
দূরে বিস্তীর্ণ জলাভূমি, বর্ষায় যেগুলো ছোট ছোট বিলে রূপ নিত, সেই জলের বুকেই নাকি জন্ম নিত আলেয়ার আলো। মুরুব্বিরা বলতেন, গভীর রাতের নিস্তব্ধতায় হঠাৎ এক নীলচে বা ফ্যাকাশে সাদা শিখা জ্বলে ওঠে—কখনো স্থির, কখনো চলমান, যেন কোনো অদৃশ্য পথিক তার হারানো ঠিকানা খুঁজে ফিরছে।
এই বর্ণনা শোনার মুহূর্তেই আমাদের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত কাঁপন জেগে উঠত। ভয় আর কৌতূহল তখন একই স্রোতে ভেসে যেত।
আমরা চাইতাম না শুনতে, আবার না শুনেও থাকতে পারতাম না। যেন সেই গল্প আমাদের ভেতরে এক অদৃশ্য দরজা খুলে দিত, যার ওপারে অপেক্ষা করত অজানা এক জগৎ।
শৈশবের সেই সন্ধ্যাগুলো আজও মনে পড়লে হৃদয় ভারী হয়ে ওঠে। সূর্য ডোবার পরই গ্রামের আকাশে নেমে আসত এক অপার্থিব নীরবতা।
দূরের মসজিদের আজান, পুকুরপাড়ের বাতাসে ভেসে আসা জলজ শব্দ, আর ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা সংগীত—সব মিলিয়ে এক রহস্যময় আবহ তৈরি হতো। আমরা উঠানে বসে গল্প করতাম, আর বড়রা আলেয়ার কথা শুরু করলেই আমাদের শ্বাস যেন থেমে যেত।
একটি ঘটনা আজও স্মৃতির গভীরে অমলিন হয়ে আছে।
শরতের শেষ প্রহর, আকাশে ছিল অসংখ্য তারার ঝিকিমিকি, কিন্তু চাঁদ ছিল অনুপস্থিত। বাতাস ছিল হিমেল নীরবতায় ভরা।
আমরা কয়েকজন সমবয়সী আমার জ্যাঠা আবু তাহের মেম্বার বাড়ীর দরজার মক্তবের মধ্যে বসে আছি রাতের বেলায়, খেলাধুলার পর গল্প করছিলাম। হঠাৎই আমার জেঠাতো ভাই নুরউদ্দিন উত্তর পাশের চৌকিদারের বাগানের দিকে ইশারা করে ফিসফিস করে বলল—“ওই দেখ…”
আমরা তাকিয়ে দেখি—অন্ধকারের বুক চিরে এক ক্ষীণ নীলাভ আলো ধীরে ধীরে জ্বলে উঠছে। প্রথমে মনে হলো চোখের ভুল, কোনো বিভ্রম। কিন্তু মুহূর্তের পর মুহূর্তে সেই আলো আরও স্পষ্ট হতে থাকল। কখনো উজ্জ্বল, কখনো ম্লান, আবার কখনো যেন মাটির গভীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
মুহূর্তেই আমাদের হাসি থেমে গেল। শরীরের ভেতর দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল। কেউ কথা বলতে পারছিল না, কেউ কারও হাত শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। চোখে ভয়, হৃদয়ে বিস্ময়, আর মনে এক অজানা প্রশ্ন—এ কী?
ঠিক সেই মুহূর্তে মাইনউদ্দিন ভাই গম্ভীর কণ্ঠে বললেন—“ওটাই আলেয়া।”
এই একটি বাক্য আমাদের শিশুমনে এক অদৃশ্য কম্পন সৃষ্টি করল।
মনে হলো, অন্ধকারের ভেতর সত্যিই কোনো জীবন্ত রহস্য লুকিয়ে আছে, যা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে, আমাদের ডাকছে, আবার দূরে সরিয়েও দিচ্ছে।
সেই রাতের পর বহু রাত কেটে গেছে, কিন্তু সেই অনুভূতি কখনো পুরোনো হয়নি।
গ্রামের রাতের শব্দ—ব্যাঙের ডাক, বাতাসে নড়ে ওঠা পাতার শব্দ, জলের ঢেউয়ের নরম কোলাহল—সবকিছু আজও মনে পড়ে এক গভীর নস্টালজিয়ার মতো।
আলেয়ার আলো শুধু ভয় জাগাত না—সে আমাদের কল্পনার জগৎকে বিস্তৃত করত। আমরা ভাবতাম, এই আলো কোথা থেকে আসে? কারা তাকে জ্বালায়?
সে কি হারিয়ে যাওয়া আত্মার পথচিহ্ন, নাকি প্রকৃতির কোনো অজানা ভাষা?
এই প্রশ্নগুলোই আমাদের শৈশবকে ধীরে ধীরে চিন্তার দিকে নিয়ে গিয়েছিল—যেখানে ভয় রূপ নেয় কৌতূহলে, আর কৌতূহল রূপান্তরিত হয় জ্ঞানের প্রথম আলোয়।
সময়ের স্রোতে আমরা বড় হলাম। বই, শিক্ষা, বিজ্ঞান আমাদের বাস্তবতার নতুন দরজা খুলে দিল।
পরে জানতে পারলাম, জলাভূমির পচনশীল জৈব পদার্থ থেকে নির্গত গ্যাস বাতাসের সংস্পর্শে এসে দাহ্য হয়ে ক্ষণিকের জন্য আলো সৃষ্টি করতে পারে—যা অনেক সময় আলেয়ার আলোর মতোই দেখা যায়।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো,
এই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আমাদের শৈশবের রহস্যকে মুছে ফেলতে পারেনি।
বরং আরও গভীরভাবে অনুভব করতে শিখিয়েছে—সব রহস্যের উত্তর থাকলেও, অনুভূতির রহস্য কখনো শেষ হয় না।
আজ যখন সেই পুরোনো গ্রামকে দেখি, দেখি পরিবর্তনের এক ভিন্ন চিত্র। জলাভূমি ভরাট হয়েছে, মাঠের অনেক অংশে গড়ে উঠেছে বাড়িঘর, রাস্তা, মানুষের ব্যস্ত জীবন।
প্রকৃতির সেই নীরব রহস্যময়তা যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে।
তবু আমি জানি—আলেয়ার আলো হারায়নি। সে রয়ে গেছে আমাদের স্মৃতির গভীরে, এক নিঃশব্দ দীপশিখার মতো, যা সময়ের ঝড়েও নিভে যায় না।
সে এখন আর মাঠে দেখা যায় না, কিন্তু হৃদয়ের গভীরে সে আজও জ্বলে ওঠে—কখনো স্মৃতির আলোয়, কখনো নীরব দীর্ঘশ্বাসে।
কারণ শৈশব কখনো সত্যিই হারায় না—সে শুধু রূপ বদলায়। সময় তাকে ঢেকে দেয়, কিন্তু মুছে ফেলতে পারে না।
আর সেই অদৃশ্য রূপান্তরের নামই যেন “আলেয়ার আলো”—যা আমাদের শেখায়, জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য শুধু দেখা নয়, অনুভব করা।
আর সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো বিস্ময়—যা মানুষকে জীবন্ত রাখে, স্বপ্নময় রাখে, এবং চিরকাল শৈশবের সঙ্গে বেঁধে রাখে।
এইভাবেই আমাদের দুরন্ত শৈশবের পাতায় আলেয়ার আলো শুধু একটি ঘটনা নয়—এটি এক অনন্ত উপাখ্যান, যা সময়ের নদী পেরিয়ে আজও হৃদয়ের অন্ধকারে নীরবে জ্বলজ্বল করে।

ফেসবুকে লাইক দিন