আধুনিকতার নির্মম স্রোতে হারিয়ে গেছে আমাদের গ্রামের সেই ঐতিহ্যবাহী খাবার ১৮২ অধ্যায়

মহিউদ্দিন মহিন: আমার শৈশবের স্মৃতির ভাণ্ডার খুলে বসলে যে জগতটি আজও হৃদয়ের গভীরতম কোণে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে জেগে ওঠে, তা হলো আমাদের গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী খাবারের অপার্থিব স্বাদ ও সুবাসে ভরা দিনগুলো। সেই দিনগুলো ছিল নিছক খাদ্যগ্রহণের সময় নয়; বরং ছিল ভালোবাসা, পারিবারিক মমতা, আন্তরিকতা, ঐতিহ্য এবং প্রকৃতিনির্ভর জীবনবোধের এক অপরূপ উৎসব। আজকের যান্ত্রিক সভ্যতার ব্যস্ততার ভিড়ে দাঁড়িয়ে যখন অতীতের দিকে ফিরে তাকাই, তখন মনে হয়—আমাদের শৈশব যেন এক বিশাল স্বাদের রাজ্য ছিল, যেখানে প্রতিটি খাবারের সঙ্গে মিশে ছিল মায়ের স্নেহ, দাদির প্রজ্ঞা, খালাদের ব্যস্ততা, চাচিদের হাসিমাখা মুখ এবং নানিদের অমলিন ভালোবাসা।
বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাস এলেই আমাদের গ্রামজীবন যেন এক অন্য রূপ ধারণ করত। চারদিকে আম, কাঁঠাল, জাম, চালতা, ডুমুর, তেঁতুল, কাঁচকলা, কাঁচা পেঁপে, পুইশাক, কচু, সিমের বিচি, মিষ্টি কুমড়া, ঢেঁকি শাক—নানান ফল-ফলাদি ও তরিতরকারির প্রাচুর্যে ভরে উঠত গ্রামবাংলার উঠান। আর এই সময়েই আমাদের মা, খালা, চাচি, নানি ও দাদিরা তৈরি করতেন এক বিস্ময়কর ঐতিহ্যবাহী রান্না—ভোলা জেলার আঞ্চলিক ভাষায় “আডোরা”, আর স্থানীয়ভাবে অধিক পরিচিত “পাঁচন” নামে। আমার দাদি মনেজা খাতুন ছিলেন এই পাঁচন রান্নার এক অসাধারণ দক্ষ রাঁধুনি। তিনি ছিলেন সম্ভ্রান্ত পরিবারের বুদ্ধিমতী, দূরদর্শী ও কর্মঠ নারী। তাঁর হাতের রান্নার স্বাদ আজও আমার জিভে নয়, হৃদয়ের গভীরে গেঁথে আছে। তিনি বলতেন, “পাঁচনের আসল স্বাদ আসে ধৈর্য আর যত্নে।” সত্যিই, সেই রান্না ছিল যেন এক শিল্পকর্ম।
দাদি প্রায় আঠারো রকমের ফল, ডাল ও শাকসবজি একত্র করে পাঁচন রান্না করতেন। কাঁচা আম, কাঁচা কাঁঠাল, কাঁচকলা, কাঁচা পেঁপে, আলু, মুগ ডাল, মসুর ডাল, খেসারি ডাল, পিয়াজকলি, সিমের বিচি, তেঁতুল, কাঁটা কচুর মুড়া, পুইশাকের ডাঁটা, ডুমুর, ঢেঁকি শাক, চালতা, তিল, কাঠবাদাম, চিনাবাদাম, কালোজিরা, পাঁচফোড়ন—কত উপকরণ যে লাগত, তার শেষ ছিল না। মাটির চুলার ধোঁয়ার মধ্যে ধীরে ধীরে সিদ্ধ হতে থাকা সেই পাঁচনের টক-মিষ্টি-ঝাল মিশ্রিত অপার্থিব ঘ্রাণ যেন পুরো বাড়িকে এক মায়াময় আবেশে ভরে তুলত। আজকের আধুনিক ফাস্টফুডের যুগে দাঁড়িয়ে সেই স্বাদের সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা চলে না।
আমার দাদা খোরশেদ আলম আমায় কোলের শিশুকালেই ইন্তেকাল করেছিলেন। মায়ের মুখে শুনেছি, আমি যখন ছোট্ট শিশু, দাদা আমাকে কোলে নিলে অল্পক্ষণ পরেই ক্লান্ত হয়ে যেতেন। তখন তিনি মাকে ডেকে বলতেন, “বউ, আমি অড়ান হয়ে যাই, তোমার পুতেরে নাও কোলে।” ভোলা জেলার আঞ্চলিক ভাষার সেই শব্দগুলো আজও আমার কানে ভাসে। যদিও আমি তাঁকে স্মৃতিতে ধারণ করার মতো বয়সে পৌঁছাতে পারিনি, তবুও তাঁর প্রতি এক অদ্ভুত মমতা আজও বুকের ভেতর রয়ে গেছে।
আমাদের শৈশবের আরেক বিস্ময়কর খাবার ছিল “কাজী শিন্নি”। সেই খাবারের মৌমৌ টক-মিষ্টি গন্ধ আজও আমার নাকে লেগে আছে। আমাদের মাটির রসুই ঘরে মা যখন ভাত রান্না করতেন, তখন আধা-ফোটা দুটগ্গি চালের ভাতের গরম পানি একটি বড় মাটির হাড়িতে ঢেলে রাখতেন। প্রতিদিন নতুন করে সেই পানির সঙ্গে ভাতের মাড় যোগ হতো। এভাবে সাত দিন ধরে চলত জমিয়ে রাখার প্রক্রিয়া। সপ্তম দিনে মা নানা রকম মসলা, কাঁচামরিচ, বোম্বাই মরিচ মিশিয়ে রান্না করতেন সেই বিখ্যাত কাজী শিন্নি। রান্নার সময় যে গন্ধ উঠত, তা যেন পুরো বাড়ির বাতাসকে মাতাল করে তুলত। আহা! সেই স্বাদ আজও স্মৃতির অলিন্দে সুগন্ধ হয়ে ভাসে।
কিন্তু একদিন বড় ভাই হারুন অর রশিদ কলেজ থেকে এসে জানালেন—এ ধরনের ফারমেন্টেড খাবার অনেক সময় খাদ্যবাহিত রোগের কারণ হতে পারে। তারপর থেকে আমাদের পরিবারে আর কখনো কাজী শিন্নি রান্না হয়নি। তবুও তার স্মৃতি আজও আমার হৃদয়ে এক অপূর্ব বিষণ্নতার আবরণ হয়ে আছে।
আমাদের মা-খালা-চাচিরা নানা জাতের পাকা কলার বিচি ফেলে দিয়ে চাল বা আটার গুঁড়ার সঙ্গে মিশিয়ে বিশেষ কায়দায় “পাত পিঠা” বানাতেন। কলাপাতায় মুড়ে টিনের তাওয়ার ওপর হালকা আঁচে সেই পিঠা সেঁকা হতো। ধীরে ধীরে যখন কলাপাতার ভেতর থেকে মিষ্টি ঘ্রাণ বের হতো, তখন পুরো উঠান সুবাসে ভরে উঠত। সেই কলাপাতার ঘ্রাণমাখা পাত পিঠার স্বাদ আজও আমাকে শৈশবের উঠানে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
আমাদের অঞ্চলের আরেক দুর্লভ ঐতিহ্যবাহী খাবার ছিল “ওগলের গুঁড়ার পিঠা-পায়েশ”। বিছনাপাতা গাছের ফুলের পরাগরেণু থেকে তৈরি হতো এই ওগল। এটি ছিল ভোলা জেলার এক জনপ্রিয় অথচ আজ প্রায় বিলুপ্ত খাবার। এর স্বাদের চেয়েও এর গন্ধ ছিল বেশি মাদকতাময়। আজও মাঝেমধ্যে বাজারে পাওয়া গেলেও তা অত্যন্ত দুর্লভ। শবে বরাত কিংবা শবে কদরের রাতে আমাদের গ্রামে “চৈ পিঠা” খাওয়ার বিশেষ রীতি ছিল। গ্রামের বধূরা রাতভর নারিকেল, খেজুরের গুড়, বাদাম ও খেজুরের রস দিয়ে চৈ পিঠা বানাতেন। দাদিরা বলতেন, “শবে বরাতের রাতে চৈ পিঠা না খাইলে পরকালে কেঁচো গিলাইবো।” আমরা ভয়ে ভয়ে সেই পিঠা খেতাম, অথচ খেতে বসলে মনে হতো যেন অমৃত খাচ্ছি।
আমাদের শৈশবে সকালের নাশতার অন্যতম প্রধান খাবার ছিল পান্তা ভাত আর দেশি চিংড়ি মাছের ভর্তা। আজ গ্রাম থেকে দেশি চিংড়ি মাছ অনেকটাই হারিয়ে গেছে, কিন্তু তার স্বাদ স্মৃতিতে অমর হয়ে আছে। বর্ষাকালে তাল পাকলে মা-খালারা তৈরি করতেন তালের পিঠা ও তালের পায়েস। নারিকেল, গরু কিংবা মহিষের দুধ, তালের রস আর নানা মসলায় তৈরি সেই পায়েস ছিল অবর্ণনীয় সুস্বাদু। বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানে “নকশি পিঠা” ছিল ভোলা জেলার ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কনের বাড়িতে আত্মীয়স্বজনেরা সারারাত জেগে নকশি পিঠা বানাতেন। নতুন ডেকচিতে ভরে সেই পিঠা কনের সঙ্গে পাঠানো হতো। পিঠার গায়ে সূক্ষ্ম কারুকাজ দেখে মনে হতো যেন শিল্পকর্ম। আমাদের শৈশবের জনপ্রিয় মিষ্টির মধ্যে ছিল “মনটা মিঠাই” বা “চিট মিঠাই”। খেজুর বা আখের গুড় জ্বাল দিয়ে আঠালো করে বাদাম মিশিয়ে তৈরি হতো এই মিষ্টি। একইভাবে “নকুল দানা” তৈরি হতো চিনি জ্বাল দিয়ে। মুখে দিলেই কড়মড় শব্দে ভেঙে যেত। চিতই পিঠা, বড়া পিঠা, পাক্কন পিঠা—এসবও ছিল আমাদের শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজও চোখ বন্ধ করলে সেই উনুনের ধোঁয়া আর গরম পিঠার গন্ধ যেন ভেসে আসে।
গ্রামের বাড়িতে মেহমান এলে কিংবা বিয়ে-শাদিতে রান্না হতো বড় কাতলা বা রুই মাছের রেজালা। গরু বা মহিষের দুধ, ঘি আর নানা বাটা মসলায় রান্না করা সেই রেজালা ছিল অসাধারণ সুস্বাদু। আজকের কৃত্রিম স্বাদের যুগে সেই ঘ্রাণ আর কোথাও খুঁজে পাই না। তখনকার বিয়ের পোলাওও ছিল ব্যতিক্রম। বিশাল প্লেটের মাঝখানে সামান্য পরিমাণ পোলাও এমনভাবে সাজিয়ে দেওয়া হতো যেন নুনের দানি উল্টে রাখা হয়েছে। কিন্তু সেই সামান্য পোলাওয়ের মধ্যেও থাকত খাঁটি ঘির অতুলনীয় ঘ্রাণ।
রমজানের ঈদে কাউন চাউলের নাস্তা ছিল গ্রামীণ ঐতিহ্যের অংশ। খেজুর বা আখের গুড় দিয়ে রান্না করা সেই নাস্তা মুখে একটু তুসতুসে লাগলেও ছিল অদ্ভুত মজাদার। আমাদের শৈশবের আরেক জনপ্রিয় খাবার ছিল ডাইলের বড়া। নানা রকম ডাল বেটে মসলা দিয়ে তেলে ভেজে বানানো হতো এই বড়া। অনেক ফেরিওয়ালা বাঁশের টুকরি—যাকে আমরা “হাজি” বলতাম—মাথায় নিয়ে বাড়ি বাড়ি বিক্রি করতেন।
লাউ কিংবা চাল কুমড়া দিয়ে তৈরি মোরব্বা ছিল গ্রামের আরেক অপূর্ব স্বাদের খাবার। দুধ, মসলা আর চিনি দিয়ে জ্বাল দিয়ে তৈরি সেই মোরব্বার গন্ধে পুরো ঘর মৌ মৌ করত। দেশি চিংড়ি মাছের বড়া, শুকনা ভাজা চাল-ডাল-তিলের মিশ্রণ, বৃষ্টির দিনে ভাজাপোড়া খাওয়ার আনন্দ—এসব ছিল আমাদের শৈশবের অবিচ্ছেদ্য স্মৃতি। আর ছিল আমসত্ত্ব। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে কাঁচা আম কেটে বিশেষভাবে শুকিয়ে তৈরি করা হতো আমসত্ত্ব। সারা বছর ধরে আমরা সেই টক-মিষ্টি স্বাদের আমসত্ত্ব খেতাম। আজ সময় বদলেছে। আধুনিকতার নির্মম স্রোতে হারিয়ে গেছে আমাদের গ্রামের সেই ঐতিহ্যবাহী খাবার, হারিয়ে গেছে মাটির চুলা, হারিয়ে গেছে ধোঁয়ামাখা রান্নাঘরের আবেশ। কিন্তু স্মৃতি হারায়নি। আজও চোখ বন্ধ করলে মনে হয়—রসুই ঘরের পাশে দাঁড়িয়ে আছি, চুলায় হাঁড়ি বসানো, মা নাড়ছেন পাঁচন, দাদি পাত পিঠা উল্টে দিচ্ছেন, আর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে অমৃতসম ঘ্রাণ। সেই স্বাদ আজ আর জিভে নেই—রয়ে গেছে হৃদয়ের গভীরতম অলিন্দে, চিরকালীন এক শৈশব হয়ে।
