আমার কিশোর বেলার মুজিব বাড়ির জসিম কাকা এবং তাঁদের স্নেহময় পরিবার ( ২১০ অধ্যায় )— মহিউদ্দিন মহিন

মহিউদ্দিন মহিম: জীবনে কিছু কিছু স্থান থাকে, যেগুলো কেবল একটি ভৌগোলিক ঠিকানা নয়—সেগুলো হয়ে ওঠে স্মৃতির মহাগ্রন্থ, অনুভূতির চিরস্থায়ী আশ্রয়, আত্মার গভীরে লুকিয়ে থাকা এক অনন্ত আলোকবর্তিকা।
সময়ের নির্মম স্রোত অনেক কিছু বদলে দেয়, অনেক মুখ হারিয়ে যায়, অনেক পথ মুছে যায় ধূলোর নিচে; কিন্তু শৈশব ও কৈশোরের কিছু দৃশ্য কখনো মুছে যায় না। তারা হৃদয়ের গহীনে চিরসবুজ হয়ে বেঁচে থাকে।
আমার জীবনে তেমনই এক অবিনাশী স্মৃতির নাম—জসিম মাস্টারদের কাচারি বাড়ি।
ভোলা সদর উপজেলার গঙ্গাকীর্তি গ্রামের আমার অঞ্চলের আমার প্রতিবেশী যা আমাদের বাড়ির পূর্ব দক্ষিণ কোনে অবস্থিত, সেই মুজিব বাড়ি ছিল আমাদের শৈশবের বিস্ময়ভূমি।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কাউকে যদি বলি, তিন-চার একর জমিজুড়ে বিস্তৃত একটি চৌকা বাড়ি ছিল, যার চারপাশে শুধু ফলের বাগান, পুকুর, বাঁশঝাড় আর পাখির কলতান—অনেকেই হয়তো বিশ্বাস করতে চাইবে না।
কিন্তু আমাদের শৈশবের দিনগুলো সত্যিই এমন এক প্রকৃতির রাজ্যে কেটেছে, যেখানে মানুষের লোভ ছিল কম, অথচ হৃদয়ের ঐশ্বর্য ছিল অসীম।
জনাব মোঃ জসিম উদ্দিন—আজ যিনি জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতায় উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক (পুরুষ) নির্বাচিত হয়েছেন—তিনি শুধু একজন শিক্ষক নন; তিনি আমার শৈশব-কৈশোরের শিক্ষাগুরুদের অন্যতম, আমার জীবনের গঠনপর্বের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা।
আমরা তাকে কাকা ডাকতাম। বয়সে বড় হলেও তার মমতা, আন্তরিকতা আর সহজ-সরল ব্যবহারের কারণে তিনি ছিলেন আমাদের প্রাণের মানুষ।
তিনি তখন ভোলা সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করতেন, আর আমরা ছিলাম প্রাইমারি স্কুলের ছোট ছোট ছাত্র। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মিশুক, উদ্যমী ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, নতুন কাজের উদ্যোগ, বন্ধুদের নিয়ে আনন্দ—সবকিছুতেই তিনি ছিলেন অগ্রগামী। আমাদের খেলাধুলার সময় তিনি রেফারির ভূমিকায় ছিলেন।
আমাদের শৈশব-কৈশোরের অনেকটা সময় কেটেছে তাদের কাচারি ঘরে আবাসিকভাবে থেকে।
সেই ছনের তৈরি কাচারি ঘরটি আজও আমার স্মৃতির পাতায় এক পবিত্র বিদ্যাপীঠ হয়ে আছে। দিনের বেলায় পড়াশোনা, সন্ধ্যায় হেরিকেন অথবা কুপি বাতির আলোয় মুখস্থ করা, গভীর রাতে বন্ধুদের নিয়ে গল্প আর হাসি—সব মিলিয়ে যেন এক অপার্থিব জীবন।
আমরা ছিলাম আট-দশজন সমবয়সী কিশোর। তরিক, আকবর, ফারুক, হারেছ, ইউসুফ আলী, মিজান, একসাথে থাকতাম, পড়তাম, খেতাম, খেলতাম। কত রাত যে বই মুখস্থ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছি, আবার ভোরের শিশিরভেজা বাতাসে জেগে উঠেছি—তার হিসাব নেই।
সেই সময়ে দারিদ্র্য ছিল, কষ্ট ছিল, কিন্তু হৃদয়ে ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
এক রাতে হঠাৎ আমি অসুস্থ হয়ে আমার শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় জসিম মাস্টারের মা মল্লিকা খাতুন তেলের সাথে রসুন আদা মিশিয়ে গরম করে আমার বুকে মালিশ করে দিয়েছিলেন, খুব ভোরে জসিম কাকা আমার জন্য ঔষধ এনে দিয়েছিলেন, ঔষধ খেয়ে একটু উপশম বোধ করেছিলাম।
মুজিব বাড়িটি ছিল এতটাই পরিপাটি, এতটাই সৌন্দর্যমণ্ডিত যে আমাদের পুরো এলাকায় এমন আর একটি বাড়িও ছিল না। ফুলে-ফলে সজ্জিত সেই বাড়িটি যেন প্রকৃতির হাতে আঁকা কোনো জীবন্ত চিত্রকর্ম।
বাড়ির চারপাশে অসংখ্য ফলের গাছ—পেয়ারা, তেঁতুল, জাম্বুরা, চালতা, আমড়া, তাল, নারিকেল, সুপারি—কী ছিল না সেখানে!
বিশেষ করে পেয়ারা গাছ ছিল অগণিত। আর তার মধ্যে কয়েকটি গাছের পেয়ারা ছিল ভেতরে রক্তিম লাল। সেই লাল পেয়ারার স্বাদ আজও আমার জিহ্বায় লেগে আছে। যেসব তেঁতুল খেতে মিষ্টি মজাদার বালু বালু লাগতো সেইসব তেতুল আমরা শুধু খেতাম টক তেতুল কখনো খেতাম না। ফল এত বেশি হতো যে আমরা কয়েকজন মিলে খেয়েও শেষ করতে পারতাম না।
অসংখ্য ফল পেকে মাটিতে পড়ে থাকতো। কাকপক্ষীও খেয়ে শেষ করতে পারতো না। আমরা ভালো ফলগুলো কুড়িয়ে নিয়ে খেতাম। নষ্ট ফল কখনো খেতাম না—শুধু বেছে বেছে সুন্দর ফলগুলোই সংগ্রহ করতাম।
বাড়ির চারপাশে ছিল অনেকগুলো পুকুর। সেই পুকুরগুলো ছিল জিওল মাছে পরিপূর্ণ। বিশেষ করে একটি মাছ আমাদের ভীষণ আকর্ষণ করতো—আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় যাকে বলা হতো “সেলশ বাইম মাছ”।
দেখতে অনেকটা সাপের মতো, লম্বায় এক-দুই হাত, পিচ্ছিল শরীর, কিন্তু স্বাদে অতুলনীয়। আমরা বড়শি দিয়ে মাছ ধরতাম। কিন্তু সেই মাছ ধরা যেমন কঠিন ছিল, ঘরে তুলে আনা ছিল আরও কঠিন—কারণ মাছটি ছিল ভীষণ পিচ্ছিল। আজকের মতো জলাশয় তখন দূষিত ছিল না; উন্মুক্ত খাল-বিল-পুকুরে মাছ ছিল কানায় কানায় পূর্ণ।
প্রায় প্রতিটি সুপারি গাছের মাথায় ছিল ঘুঘু পাখির বাসা।
আমরা ঘুঘুর ছানা সংগ্রহ করতাম শিশুসুলভ কৌতূহলে। চার কোণায় চারটি বিশাল বাঁশঝাড় ছিল।
ঘন অন্ধকারে ঢাকা সেই বাঁশঝাড়গুলো দেখলেই বুকের ভেতর কেমন যেন ভয় কাজ করতো। সেখানে বাস করতো নানা জাতের বিষাক্ত সাপ।
মাঝে মাঝে ঝোপঝাড় ফুঁড়ে বিশাল সাপ,বেজি, গুইসাপ, বন বিড়াল শিয়াল বেরিয়ে আসতো।
সাপের ফোঁসফোঁস শব্দ শুনে আমরা দৌড়ে পালাতাম। কতবার যে সাপের ভয়ে প্রাণপণে ছুটেছি—তার কোনো হিসাব নেই।
জসিম কাকার বাবা শেখ মুজিবুল হক আমার জন্মের আগেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। শুনেছি তিনি ছিলেন কাপড়ের ব্যবসায়ী
তার মৃত্যুর পর সব ভাইয়েরা মিলে মিশে কৃষি কাজ করতেন এবং মাঝে মাঝে বাড়ির ফল ফলাদি তরু-তরকারি বিক্রি করে সংসার চালাতেন। সকলেই পড়ালেখা করতেন, বড় বোন ভাইয়েরাও উচ্চশিক্ষিত ছিলেন।জসিম মাস্টারের বড় ভাই কাঞ্চন মিয়া আমাদের শৈশবে এইচএসসি পাশ, রতন মিয়াও শিক্ষিত।
জসিম কাকার মা, মল্লিকা খাতুন, ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক, পর্দানশীল ও স্নেহময়ী একজন নারী।
আশ্চর্যের বিষয় হলো—আমার মায়ের নামও ছিল মল্লিকা খাতুন। নামের এই মিলের কারণে তিনি আমাকে নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করতেন। আমার ফাইভের বার্ষিক পরীক্ষার সময় তিনি নিজের পালা মুরগি জবাই করে আমাদের দাওয়াত দিয়ে খাইয়েছিলেন।আমাদের সময় ফাইভের বার্ষিক পরীক্ষা কে আমাদের ভাষায় আমরা বলতাম সেন্টার পরীক্ষা।
আমরা তাকে দাদি ডাকতাম।
ইলিশ মাছ ভাজতে গিয়ে মাছের ডিম সহ তেল ছিটকে তার একটি চোখ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তিনি সবসময় কাপড় দিয়ে চোখ ঢেকে রাখতেন।
বহিরাগত কারও সামনে খুব একটা আসতেন না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কালাম পড়তেন, কোরআন হাদিস পাঠ করতেন নিয়মিত।
কিন্তু আমরা ছোট ছিলাম বলে আমাদের সামনে আসতেন, গল্প করতেন, আদর করতেন। তার মমতা আজও হৃদয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
পরবর্তীতে জসিম মাস্টার তার মায়ের নামে “মল্লিকা হক মাধ্যমিক বিদ্যালয়” প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বাবার নাম মুজিবুল হক মায়ের নাম নামের সাথে বাবার নামের শেষ অংশ ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মল্লিকা হক মাধ্যমিক বিদ্যালয়। তিনি প্রতিষ্ঠা কালীন থেকে ওই স্কুলের একজন মেধাবী শিক্ষক ছিলেন। পরে স্কুলটির নাম পরিবর্তন হয়ে অন্য নামে পরিচিত হয়। গুলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। পরবর্তীতে জসিম মাস্টার তার প্রতিষ্ঠিত গুলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে প্রাইমারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রাইমারির প্রধান শিক্ষক হিসেবে চাকরি শুরু করেন।
কিন্তু আমার কাছে সেটি আজও মল্লিকা দাদির স্মৃতিবাহী প্রতিষ্ঠান হিসেবেই রয়ে গেছে।
তার বাবা মুজিবুল হক আমাদের জন্মের পূর্বেই ইন্তেকাল করেছেন আমরা কখনো তাকে দেখিনি।
তার বোন জান্নাতুল ফেরদৌস ছিলেন আমাদের সহপাঠী। একসাথে আমাদের বাড়ির দরজার মক্তবে পড়ালেখা করতাম। জান্নাতুল ফেরদৌস জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে ১০-১১ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুতে আমাদের শিশু মন অঝোরে কেঁদেছিল। আমরা সহপাঠীরা একসাথে তার লাশের পাশে বসে অঝোরে কান্না করেছিলাম। হৃদয়ে আচর কেটেছে যা আজও বেদনার স্মৃতি হয়ে দাগ কেটে আছে। আজও স্মৃতিতে জান্নাতুল ফেরদৌসের সাথে বসে যেন মক্তবে পড়াশোনা করছি স্বপ্নের জগতে ফিরে যাই।
শীতের রাতগুলো ছিল সবচেয়ে আনন্দময়। কাচারি ঘরে বসতো খেজুর রসের ফিন্নিপায়েসের আসর। গভীর রাতে আমরা কুপি বাতি হাতে খেজুর গাছের রস আনতে যেতাম।
সঙ্গে থাকতো শুকনা নারিকেল। নারিকেল গাছ থেকে নারিকেল পেড়ে আনা, আগুন জ্বালিয়ে রস জ্বাল দেওয়া, তারপর ফিন্নিপায়েস রান্না—সব মিলিয়ে যেন এক স্বপ্নময় উৎসব।
সেই রাতগুলোতে কাচারি ঘরের চারদিকে আগুনের লাল আভা পড়তো। বাতাসে ভেসে বেড়াত খেজুর রসের মিষ্টি গন্ধ, নারিকেলের ঘ্রাণ আর কিশোরদের উচ্ছ্বাসমাখা হাসি। মনে হতো পৃথিবীতে এর চেয়ে সুখের জীবন আর কিছু হতে পারে না।
অনেক সময় লুঙ্গির কোঁচায় ফল-ফলাদি ভরে বাড়ি ফিরতাম। তখন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ মনে হতো। কারণ আমাদের সম্পদ ছিল প্রকৃতির অফুরন্ত দান, নির্মল আনন্দ আর সম্পর্কের উষ্ণতা।
আজকের পৃথিবীতে এসে যখন দেখি মানুষের মধ্যে স্বার্থ, কৃত্রিমতা আর বিচ্ছিন্নতা বেড়ে গেছে, তখন সেই কাচারি বাড়ির কথা আরও বেশি মনে পড়ে। সেখানে মানুষ ছিল সহজ, সম্পর্ক ছিল আন্তরিক, ভালোবাসা ছিল নিঃস্বার্থ।
জসিম মাস্টারকে আমি শৈশব থেকেই একজন সৎ, নিষ্ঠাবান ও মানবিক মানুষ হিসেবে দেখেছি।
শিক্ষকতা পেশার মাধ্যমে তিনি আজও মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন। তার মতো মানুষের সংস্পর্শে থাকতে পেরেছি—এটাই আমার জীবনের এক বড় সৌভাগ্য।
আমার দুরন্ত শৈশব, কিশোর বেলার স্বপ্ন, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা দিনগুলো, বন্ধুদের আড্ডা, কাচারি ঘরের রাত, ফলের বাগানের সুবাস, সাপের ভয়, পুকুরের মাছ, দাদির স্নেহ—সবকিছু মিলিয়ে জসিম মাস্টারদের কাচারি বাড়ি আজ আমার হৃদয়ের গভীরে এক অমর স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে আছে।
সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে, অনেক কিছু হারিয়ে গেছে। হয়তো সেই কাচারি ঘর আর আগের মতো নেই, হয়তো বাঁশঝাড়গুলো কেটে ফেলা হয়েছে, হয়তো পুকুরের জলও আর আগের মতো স্বচ্ছ নয়। কিন্তু স্মৃতির ভেতরে সেই বাড়ি আজও আগের মতোই জীবন্ত।
আমার কাছে জসিম মাস্টারদের কাচারি বাড়ি কেবল একটি বাড়ি নয়—ওটাই ছিল আমাদের বেড়ে ওঠার বিশ্ববিদ্যালয়, মানবিকতার বিদ্যালয়, প্রকৃতির পাঠশালা।
যতদিন বেঁচে থাকবো, ততদিন হৃদয়ের গভীরে অম্লান হয়ে থাকবে সেই দুরন্ত শৈশবের কাচারি বাড়ি— যেখানে আমার কৈশোর হেসেছে, শিখেছে, স্বপ্ন দেখেছে।
আর সেই স্মৃতিগুলোই হয়তো একদিন আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে।
