আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে চান? - বিস্তারিত
  • শুক্রবার, ২৬শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১০ই জুলাই, ২০২৬ ইং, ২৩শে মুহাররম, ১৪৪৮ হিজরী

ভয়াল ১২ নভেম্বর: ইতিহাসের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে হারিয়ে যাওয়া লাখো প্রাণের স্মৃতিচারণে উপকূল দিবস–মোঃ মহিউদ্দিন

মোঃ মহিউদ্দিন: ১২ নভেম্বর—বাংলাদেশের ইতিহাসে এক শোকাবহ, হৃদয়বিদারক দিন। ১৯৭০ সালের এই দিনটিতে সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগ—প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। সেই রাতেই উপকূলের আকাশে তাণ্ডব শুরু হয়। ১৮৫ কিলোমিটার বেগে বয়ে যাওয়া ঝড়ের সঙ্গে যখন ২৫ থেকে ৩০ ফুট উঁচু সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস তীর ভাসিয়ে আনে, তখন মুহূর্তেই মুছে যায় হাজারো গ্রাম, ভেসে যায় অসংখ্য প্রাণ।প্রায় দশ লক্ষ মানুষ এবং অগণিত গৃহপালিত পশু-পাখি সেদিন অকালে প্রাণ হারায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ভোলা, পটুয়াখালী, রামগতি, হাতিয়া, সন্দ্বীপ ও বিশেষ করে তজুমদ্দিন উপজেলা। কেবল তজুমদ্দিনেই প্রাণ হারিয়েছিল প্রায় নব্বই হাজার মানুষ।
ভোলা জেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ মনপুরায়ও মারা যায় প্রায় বিশ হাজার মানুষ—যাদের অনেকেই চিরদিনের মতো নিখোঁজ হয়ে যান সাগরের গর্ভে।
ঘূর্ণিঝড়ের সেই রাতে উপকূলের প্রতিটি ঘর, প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি জীবন যেন ছিল মৃত্যুর সাথে লড়াইয়ে। সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে ভেসে যায় ঘরবাড়ি, ফসলের ক্ষেত, গবাদি পশু—সবকিছু। বেঁচে যাওয়া মানুষগুলো পরে কাটায় ভয়াবহ মানবেতর জীবন। খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে ছড়িয়ে পড়ে দুর্ভিক্ষ, কলেরা, ডায়রিয়া, পানিবাহিত রোগে আবারও প্রাণ হারায় অসংখ্য মানুষ। আজও সেই ভয়াল রাতের স্মৃতি ভোলার মানুষের চোখে জল এনে দেয়। ব্যক্তিগত বেদনাময় অভিজ্ঞতাও এর সাক্ষী- আমার স্ত্রীর বড় ভাই প্রখর জলের স্রোতে মায়ের হাত থেকে ছুটে গিয়ে চিরদিনের মতো হারিয়ে যান সেই রাতে। এখনও তজুমদ্দিন ও মনপুরার বৃদ্ধরা যখন সেই রাতের কথা বলেন, তাঁদের কণ্ঠ কেঁপে ওঠে, চোখ ভিজে যায় অঝোর অশ্রুতে। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে আজ বাংলাদেশ ও বিশ্ববাসী ১২ নভেম্বরকে “উপকূল দিবস” বা “World Coastal Day” হিসেবে পালন করে, শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে সেইসব অজস্র নিরীহ প্রাণ যারা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াল গ্রাসে বিলীন হয়েছিল। প্রলয়ঙ্করী সেই ঘূর্ণিঝড় কেবল এক রাতের ঘটনা নয়, এটি ইতিহাসের এক নির্মম স্মারক—যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষের অসহায়তা এবং মানবিক প্রস্তুতির গুরুত্ব। আজকের “উপকূল দিবস” তাই শুধু শোকের দিন নয়, এটি একটি সচেতনতার প্রতীক, যাতে আমরা ভবিষ্যতের দুর্যোগে হারিয়ে না ফেলি আর কোনো তজুমদ্দিন, মনপুরা বা ভোলা।

ফেসবুকে লাইক দিন