আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে চান? - বিস্তারিত
  • মঙ্গলবার, ১৩ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জুলাই, ২০২৬ ইং, ১২ই সফর, ১৪৪৮ হিজরী
সর্বশেষঃ

গাছের ছায়ায় বেড়ে ওঠা: সামাজিক বনায়নের সবুজ স্মৃতি ১৫৯ অধ্যায়

মহিউদ্দিন মহিন: নব্বই দশকের শুরু। আমি তখন ছাত্র। কৈশোরের সোনালি দিনগুলো ধীরে ধীরে স্বপ্নের ডানা মেলছে।
ঠিক সেই সময়েই আমাদের প্রিয় ভোলা জেলার নাছির মাঝি এলাকার মেঠোপথ জুড়ে শুরু হয় এক অনন্য সবুজ বিপ্লব। আজ এত বছর পরও চোখ বন্ধ করলেই সেই দিনগুলোর দৃশ্য স্পষ্ট হয়ে ভেসে ওঠে—কাঁধে কোদাল, হাতে গাছের চারা, বুকভরা স্বপ্ন আর চারদিকে মানুষের উৎসাহে মুখরিত এক গ্রাম।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বন বিভাগের উদ্যোগে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি শুরু হয় আশির দশকের শুরুতে। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালের পর এই কর্মসূচি আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে।
ভোলা, নোয়াখালী, পটুয়াখালী, চট্টগ্রামসহ সমগ্র উপকূলীয় অঞ্চলে রাস্তার দুই ধারে, বাঁধের পাশে এবং মালিকানাধীন জমির সীমানা ঘেঁষে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশ সংরক্ষণ, উপকূলকে সবুজে আচ্ছাদিত করা, জ্বালানি কাঠ ও মূল্যবান কাঠ উৎপাদন, ভূমিক্ষয় রোধ এবং স্থানীয় জনগণকে বনায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা।
আমাদের নাছির মাঝি এলাকায় এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয় নব্বই দশকে। গ্রামের মেঠোপথের দুই পাশে যাঁদের নিজস্ব জমি ছিল, তাঁদের নিয়ে বন বিভাগ একটি উপকারভোগী কমিটি গঠন করে। সরকারি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করে আমরা সেই কর্মসূচির অংশীদার হই। আমার কাছে সংরক্ষিত আজও সেই সরকারি দলিলের কথা মনে পড়লে বুকের ভেতর এক অদ্ভুত গর্বের অনুভূতি জেগে ওঠে।
মনে হতো, আমরা যেন কেবল গাছ লাগাচ্ছি না—আমরা ভবিষ্যতের জন্য জীবন রোপণ করছি।
আমাদের এলাকার সম্মানিত আবু ইউছুফ দারোগা সাহেবকে সভাপতি করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। আমি ছিলাম সেই কমিটির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। বয়সে ছোট হলেও আমাকে সেক্রেটারির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আজ ভাবলে বিস্মিত হই—সেই অল্প বয়সে গ্রামের প্রবীণ মানুষদের পাশে দাঁড়িয়ে একটি সরকারি কর্মসূচির দায়িত্ব পালন করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।
কমিটির সদস্য ছিলেন নাছির মাঝি এলাকার আব্দুল খালেক মেম্বার, জয়নাল আবেদীন মেম্বারের ছেলে মানিক মিয়া, মকবুল আহমেদ মুন্সিবাড়ির কাসেম ম্যানেজার, শফি মাল, সুলতান চৌকিদার, আমার বড় চাচা আবু তাহের মেম্বার, আক্তার দফাদার, আব্দুর রব ড্রাইভারসহ আরও অনেকেই। তাঁরা সবাই ছিলেন আমার চেয়ে অনেক বয়সে বড়। সময়ের নির্মম নিয়মে আজ প্রায় সবাই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। সেই দীর্ঘ তালিকার মধ্যে আমি যেন নাছির মাঝি এলাকার সামাজিক বনায়নের একমাত্র জীবিত সাক্ষী হয়ে আছি। তাঁদের স্মৃতি আজও আমার হৃদয়ের গভীরে সবুজ পাতার মতো দুলে ওঠে।
যতদূর মনে পড়ে, বন বিভাগের যাঁরা আমাদের নিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন আনোয়ার ভাই, বাসু মিয়া, সুব্রত বাইন ও ফরিদ আহমদ। তাঁদের আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও শ্রম আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। সরকারি চাকরির সীমাবদ্ধতার ভেতর থেকেও তাঁরা যেন একজন কৃষকের মতো প্রতিটি চারাকে নিজের সন্তানের মতো লালন করতেন।
তাদের সাথে বন্ধুর মতো সখ্যতা হয়েছিল আমার সারাদিন কাজ করে দুপুরবেলা আমাদের বাড়িতে সকলে খাবার খেতেন, বর্ষাকালে অবসর সময়ে আমাদের পুকুরে বরশি দিয়ে বড় বড় মাছ ধরতেন। আমাদের ঘরে ক্লান্ত শরীরে ঘুমাতেন। আমাদের সাথে বন বিভাগের কর্মচারী কর্মকর্তারা জীবনের সাথে বন্ধুত্বের মতো মিশে গিয়েছিল।
রাস্তার দুই পাশে সারি সারি করে রোপণ করা হয়েছিল আকাশমণি, ইউক্যালিপটাস, মেহগনি, কড়ই, নিম, বাবলা, অর্জুন, শিশু (সিসু), আর কোথাও কোথাও সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য কৃষ্ণচূড়া ও রাধাচূড়া। প্রতিটি চারা যেন নতুন জীবনের প্রতীক ছিল। মাটির বুকে সবুজের অক্ষর লিখে যাচ্ছিল আমাদের ছোট্ট হাত।
শুধু গাছ লাগিয়েই বন বিভাগের কাজ শেষ হয়নি। প্রতিটি চারার নিবিড় পরিচর্যা করা হতো, নিয়মিত সার প্রয়োগ করা হতো । চারাগুলোকে গবাদিপশুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য বেষ্টনী হিসেবে ওরহর ডালের গাছ লাগানো হয়েছিল। সেই ওরহর গাছ অল্পদিনেই বেড়ে উঠে প্রাকৃতিক বেড়ার মতো চারাগুলোকে আগলে রাখত।
আমরা প্রতিদিন পানি দিতাম, আগাছা পরিষ্কার করতাম, মাটি কুপিয়ে দিতাম। নিজের হাতে লাগানো প্রতিটি গাছের সঙ্গে যেন আমাদের আত্মার সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
অল্প দিনের মধ্যেই রাস্তার দুই পাশ সবুজ ছায়ায় ঢেকে গেল। শিশু গাছের কোমল পাতাগুলো বাতাসে দুলে উঠলে মনে হতো, যেন অদৃশ্য কোনো কবি আকাশের নীল ক্যানভাসে ছন্দ লিখে চলেছেন। ঝিরিঝিরি বাতাসে পাতার মৃদু শব্দ শুনে মনে হতো প্রকৃতি নিজেই যেন আমাদের জন্য গান গাইছে।
সেই গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে কত গল্প করেছি, কত স্বপ্ন দেখেছি, কত দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে ভবিষ্যতের কল্পনা বুনেছি—তার কোনো হিসাব নেই।
আমরা যেমন ধীরে ধীরে বড় হয়েছি, তেমনি আমাদের লাগানো গাছগুলোও বড় হয়েছে।
মনে হতো, আমাদের শৈশব আর গাছের বেড়ে ওঠা যেন একই গল্পের দুটি অধ্যায়। আমরা বেড়ে উঠেছি গাছের ছায়ায়, আর গাছগুলো বেড়ে উঠেছে আমাদের ভালোবাসায়।
কিন্তু মানুষের লোভ প্রকৃতির সবচেয়ে বড় শত্রু। সময়ের প্রবাহে বন বিভাগের তদারকি কমে এলো। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদাসীনতা ও অযত্নের সুযোগে যাঁদের বাড়ির পাশে গাছ ছিল, তাঁদের অনেকেই গভীর রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে সরকারি গাছ কেটে নিতে শুরু করলেন।
কেউ নিজের প্রয়োজনে, কেউ আবার লোভের বশবর্তী হয়ে একের পর এক সবুজ বৃক্ষ নিধন করলেন।
২০০০ সালের পর থেকে সেই সবুজ বনানীর অধিকাংশই ধীরে ধীরে উজাড় হয়ে গেল। অনেক গাছ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেল, আবার অনেক গাছ মানুষের কুঠারের আঘাতে প্রাণ হারাল। আমাদের সঙ্গে সরকারি চুক্তি ছিল—গাছ পরিপক্ব হলে বিক্রয়মূল্যের একটি অংশ পাবেন জমির মালিক, একটি অংশ পাবেন আমরা উপকারভোগী সদস্যরা এবং বাকি অংশ যাবে বাংলাদেশ সরকারের বন বিভাগের তহবিলে। কিন্তু সেই চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়নের আগেই অসংখ্য গাছ অবৈধভাবে কেটে ফেলা হলো।
আজও কিছু মেহগনি গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মোটা কাণ্ডে সময়ের ইতিহাস লেখা রয়েছে। কিন্তু সেই গাছগুলোর প্রতিও অনেকের লোভনীয় দৃষ্টি। মাঝেমধ্যে গভীর রাতে চোরের মতো কেটে নিয়ে যায় কেউ কেউ। আবার অনেকে রাস্তার পাশে ঘরবাড়ি বা দোকান নির্মাণ করতে গিয়ে সরকারি গাছ গোপনে কেটে ফেলে।
কেউ কেউ পুরো গাছ কাটতে না পেরে এমনভাবে ডালপালা ছেঁটে দেয় যে গাছ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে মারা যায়। পরে সেই মৃত গাছ ভেঙে পড়ে, আর একটি সবুজ ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটে।
এসব খবর যখন শুনি কিংবা নিজের চোখে দেখি, তখন বুকের ভেতর যেন রক্তক্ষরণ শুরু হয়। মনে হয়, আমার নিজের শৈশবেরই একটি অংশ কেউ কেটে নিয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও নিই না।
কারণ প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা করে তাঁদের কঠিন শাস্তির মুখে ঠেলে দিতে মন সায় দেয় না। তবু অন্তরের গভীরে একটি দীর্ঘশ্বাস থেকে যায়—মানুষ কেন নিজের অস্তিত্বের শত্রু হয়ে ওঠে?
ভোলা একটি দ্বীপ জেলা। চারদিকে মেঘনা নদী, অসংখ্য খাল এবং বঙ্গোপসাগরের জলরাশি। একটু ঝড়, একটু জলোচ্ছ্বাস, একটু প্রবল বাতাস—সবকিছুই এই জনপদের মানুষের জীবনকে অনিশ্চিত করে তোলে। এই বৃক্ষরাজিই আমাদের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। তারা ঝড়ের গতি কমায়, ভূমিক্ষয় রোধ করে, পরিবেশকে শীতল রাখে, পাখিদের আশ্রয় দেয়, জ্বালানির উৎস হয়, কাঠের যোগান দেয় এবং সবচেয়ে বড় কথা—কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে আমাদের জীবনরক্ষাকারী অক্সিজেন উপহার দেয়।
আজ পৃথিবী জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি। অথচ আমরা নিজেরাই আমাদের সবুজ ঢাল ভেঙে ফেলছি। যে গাছ একদিন আমাদের মাথার ওপর ছায়া দিয়েছে, ঝড়ের হাত থেকে রক্ষা করেছে, নির্মল বাতাস দিয়েছে—সেই গাছকেই আমরা কুঠারের আঘাতে হত্যা করছি। এর চেয়ে বড় আত্মঘাতী কাজ আর কী হতে পারে?
আজ আমি বন বিভাগের বর্তমান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি আন্তরিক আবেদন জানাই—অনুগ্রহ করে এখনও যেসব সামাজিক বনায়নের গাছ জীবিত রয়েছে, সেগুলো জরিপ করে সংরক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। অবৈধভাবে গাছ কাটার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিন। এই গাছগুলো কেবল সরকারি সম্পদ নয়; এগুলো আমাদের ইতিহাস, আমাদের স্মৃতি, আমাদের ভবিষ্যৎ।
একই সঙ্গে আমার প্রিয় এলাকাবাসীর প্রতিও বিনীত আহ্বান—আপনার বাড়ির পাশের গাছকে নিজের শত্রু নয়, নিজের অভিভাবক মনে করুন।
যে বৃক্ষ আপনাকে অক্সিজেন দেয়, ছায়া দেয়, ঝড়ের হাত থেকে রক্ষা করে, সেই বৃক্ষকে বাঁচিয়ে রাখুন। কারণ গাছ বাঁচলে প্রকৃতি বাঁচবে, প্রকৃতি বাঁচলে মানুষ বাঁচবে।
আজও যখন সেই পুরোনো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাই, মনে হয় কোথাও যেন আমার কিশোর বয়স দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসে দুলছে শিশু গাছের পাতা, মাটির গন্ধে মিশে আছে আমাদের শৈশবের হাসি, আর অদৃশ্য কোনো কণ্ঠ যেন ফিসফিস করে বলে—”মানুষের জীবনের মতোই একটি গাছও একটি ইতিহাস। ইতিহাসকে কেটে ফেলা যায়, কিন্তু তার স্মৃতিকে কখনো মুছে ফেলা যায় না।”

ফেসবুকে লাইক দিন