আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে চান? - বিস্তারিত
  • বুধবার, ১৪ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৯শে জুলাই, ২০২৬ ইং, ১৩ই সফর, ১৪৪৮ হিজরী
সর্বশেষঃ

চোর ধরা খেলা: হারিয়ে যাওয়া শৈশবের এক রঙিন লোক ঐতিহ্য

মহিউদ্দিন মহিন: শৈশব মানেই এক অনন্ত বিস্ময়ের রাজ্য। সেখানে ছিল না আধুনিক প্রযুক্তির মোহ, ছিল না মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট কিংবা ভার্চুয়াল বিনোদনের কৃত্রিম জগৎ। আমাদের আনন্দের উৎস ছিল প্রকৃতি, খোলা মাঠ, গ্রামের মেঠোপথ, সঙ্গীদের অকৃত্রিম বন্ধুত্ব এবং নানান রকম দেশজ খেলাধুলা।
সেই হারিয়ে যাওয়া খেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল “চোর ধরা খেলা”—একটি সহজ, আনন্দময় এবং লোকজ ঐতিহ্যে ভরপুর গ্রামীণ খেলা, যা একসময় আমাদের শৈশবকে প্রাণবন্ত করে তুলেছিল।
আজও স্মৃতির দরজায় কড়া নাড়লে দেখতে পাই বিকেলের কোমল রোদ, গ্রামের ধুলোমাখা উঠান, পাখির কলকাকলি আর একদল উচ্ছ্বসিত শিশু-কিশোরের প্রাণচঞ্চল সমাবেশ। স্কুল ছুটি হলে কিংবা বিকেলের অবসরে আমরা দল বেঁধে জড়ো হতাম। কারও হাতে বই থাকত না, থাকত না কোনো খেলনা কিংবা দামি সরঞ্জাম।
আমাদের খেলার উপকরণ ছিল শুধু আনন্দময় মন আর একঝাঁক সাথীর হাসিমাখা মুখ।
চোর ধরা খেলার নিয়ম ছিল অত্যন্ত সহজ, অথচ এর মধ্যে লুকিয়ে ছিল অসাধারণ উত্তেজনা। সাধারণত দুইজন খেলোয়াড় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেদের হাত উঁচু করে ধরে একটি মানব-তোরণ বা ফটকের মতো তৈরি করত। বাকি খেলোয়াড়েরা সেই তোরণের নিচ দিয়ে একে একে কিংবা সারিবদ্ধভাবে যাতায়াত করত। এ সময় দুইজন খেলোয়াড় ছন্দ মিলিয়ে একটি ছড়া আবৃত্তি করত।
ওপেন-টি বক্স, রাইট আনা ট্যাক্স, সুলতানা বিবিয়ান।
সাহেব বাবুর বৈঠকখানা, সাহেব বলেছে যেতে,পানের খিলি খেতে।
পানের আগায় মরিচ বাটা, স্প্রিংয়ের ছবি আঁটা।
সাহেব বলেছে যেতে, পানের খিলি খেতে।
ছড়াটি যতক্ষণ চলত, ততক্ষণ সবাই সতর্ক পায়ে তোরণের নিচ দিয়ে পার হওয়ার চেষ্টা করত। কিন্তু ছড়ার শেষ শব্দ উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দুইজন খেলোয়াড় হাত নামিয়ে দিত। তখন যার শরীর বা হাত সেই ফাঁদের মধ্যে আটকা পড়ত, তাকেই ঘোষণা করা হতো “চোর” হিসেবে।
কী যে আনন্দ আর হাসির রোল উঠত তখন! কেউ ধরা পড়লে সবাই একসঙ্গে হেসে উঠত। আবার কেউ যদি শেষ মুহূর্তে দৌড়ে পালিয়ে যেতে পারত, তবে সে নিজেকে বিজয়ী মনে করত। খেলাটির প্রতিটি মুহূর্তে ছিল উত্তেজনা, কৌতুক, প্রতিযোগিতা এবং নির্মল আনন্দের অপূর্ব সমন্বয়।
আমাদের গ্রামের বিকেলগুলো যেন এই খেলার প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে উঠত। কখনও বাড়ির উঠানে, কখনও ধানের খেতের আইলে, কখনও বা বিশাল বটগাছের ছায়াতলে চলত এই খেলা। দূর থেকে বড়রা আমাদের আনন্দ দেখে মুচকি হাসতেন। মায়েরা রান্নার ফাঁকে ফাঁকে সন্তানদের উল্লাসধ্বনি শুনে তৃপ্তি পেতেন। গ্রামের পরিবেশে এক ধরনের পারিবারিক উষ্ণতা ছিল, যা এই খেলাগুলোর মাধ্যমে আরও গভীর হতো।
লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, এ ধরনের খেলাগুলো শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; এগুলো শিশুদের সামাজিকীকরণ, পারস্পরিক সহযোগিতা, নেতৃত্বগুণ, উপস্থিত বুদ্ধি এবং দলগত চেতনা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। ছড়াভিত্তিক খেলাগুলো শিশুদের ভাষা শিক্ষা, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি এবং ছন্দবোধ গঠনের ক্ষেত্রেও কার্যকর ছিল। আমরা তখন এসব তাত্ত্বিক বিষয় বুঝতাম না, কিন্তু খেলতে খেলতেই জীবনের বহু মূল্যবান শিক্ষা অর্জন করতাম।
চোর ধরা খেলার ছড়াগুলোও ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এসব ছড়ার অনেক শব্দ হয়তো অর্থহীন মনে হতো, আবার কিছু শব্দ ছিল ইংরেজি, বাংলা ও লোকজ উপভাষার মিশ্রণে গঠিত। লোকসাহিত্যের গবেষণায় দেখা যায়, বাংলার গ্রামীণ সমাজে প্রচলিত অনেক ছড়াই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ছড়ার ভাষা ও উচ্চারণে ভিন্নতা দেখা গেছে। ফলে একই খেলার একাধিক সংস্করণ বিভিন্ন গ্রামে প্রচলিত ছিল।
আমাদের কাছে এসব ছড়া ছিল রহস্যময় সুরের মতো। আমরা শব্দের অর্থ বুঝতাম না, কিন্তু সুরের আনন্দ অনুভব করতাম। ছড়ার প্রতিটি চরণ উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ত—কে ধরা পড়বে, কে পালিয়ে যাবে, আর কে হবে নতুন চোর!
আজকের শিশুদের দিকে তাকালে কখনও কখনও মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। তারা হয়তো প্রযুক্তির অসংখ্য সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে, কিন্তু আমাদের মতো প্রকৃতির সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠার সুযোগ অনেকাংশে হারিয়ে ফেলছে। এখন গ্রামের উঠানগুলোও আগের মতো সরগরম নয়। মাঠে শিশুদের কোলাহল কমে গেছে। খেলার জায়গা সংকুচিত হয়েছে, আর অবসর সময় দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোনের পর্দা।
ফলে চোর ধরা খেলার মতো অসংখ্য লোকজ খেলা আজ বিলুপ্তির পথে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই হয়তো এই খেলার নাম পর্যন্ত শোনেনি। অথচ এসব খেলার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এক অমূল্য ভাণ্ডার। এগুলো ছিল আমাদের সামাজিক ঐক্যের প্রতীক, গ্রামীণ জীবনের প্রাণস্পন্দন এবং শৈশবের নির্মল আনন্দের উজ্জ্বল স্মারক।
আজ বহু বছর পরে যখন স্মৃতির আয়নায় ফিরে তাকাই, তখন সেই বিকেলগুলোর কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে বন্ধুদের উচ্ছ্বসিত হাসি, ছুটে চলা পায়ের শব্দ, ধুলো উড়িয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা আর শেষ মুহূর্তে ধরা পড়ে যাওয়া কোনো দুর্ভাগা সাথীর বিস্মিত মুখ। মনে হয়, সময় যেন কত দ্রুত বদলে গেছে! কিন্তু স্মৃতির পাতায় সেই খেলাগুলো এখনও জীবন্ত হয়ে আছে।
চোর ধরা খেলা ছিল শুধু একটি খেলা নয়; এটি ছিল আমাদের শৈশবের হাসি-কান্না, বন্ধুত্ব, উচ্ছ্বাস এবং লোকজ ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। কালের স্রোতে খেলার মাঠ হারিয়ে গেলেও, সেই দিনগুলোর স্মৃতি আজও হৃদয়ের গভীরে অম্লান হয়ে আছে। জীবনের বহু প্রাপ্তি ও অপূর্ণতার মাঝেও যখন শৈশবের কথা মনে পড়ে, তখন এই খেলার স্মৃতি যেন এক মধুর নস্টালজিয়ার সুবাস ছড়িয়ে দেয়। মনে হয়, যদি আর একবার ফিরে পাওয়া যেত সেই ধুলোমাখা বিকেল, সেই বন্ধুদের হাসি আর সেই চিরচেনা ছড়ার সুর—তবে হয়তো আবারও প্রাণভরে বলে উঠতাম, “সাহেব বলেছে যেতে, পানের খিলি খেতে।”

ফেসবুকে লাইক দিন