আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে চান? - বিস্তারিত
  • বুধবার, ২০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩রা জুন, ২০২৬ ইং, ১৫ই জিলহজ্জ, ১৪৪৭ হিজরী

“একটি নক্ষত্রের অবসান ; স্মৃতির পাতায় তোফায়েল আহমেদ”

একটি নক্ষত্রের অবসান ; স্মৃতির পাতায় তোফায়েল আহমেদ
//মো: আশরাফুল আলম //
​বাংলাদেশ তথা বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সারথি, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ এবং সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ আর নেই। ২০২৬ সালের ১ জুন, সোমবার বিকেলে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ৮২ বছর বয়সী এই জননেতা। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতা ও প্যারালাইসিসসহ নানাবিধ শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। তাঁর এই মহাপ্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বর্ণিল ও ঝোড়ো অধ্যায়ের অবসান ঘটলো।
​​১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া তোফায়েল আহমেদ ছিলেন খাঁটি অর্থেই রাজপথ থেকে উঠে আসা নেতা। ষাটের দশকের উত্তাল দিনগুলোতে ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়ে তাঁর উত্থান। ১৯৬৮-৬৯ মেয়াদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি হিসেবে তিনি তৎকালীন আইয়ুব বিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন।​বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে মূলত একটি ঐতিহাসিক ঘোষণার জন্য। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার উপচে পড়া ভিড়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন এই তরুণ ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ। সেই থেকে তিনি হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধুর অন্যতম বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সহচর। ​১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তোফায়েল আহমেদ ছিলেন অন্যতম সংগঠক। মুজিব বাহিনীর (বিএলএফ) অন্যতম প্রধান কমান্ডার হিসেবে তিনি মুক্তিসংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডির পর দীর্ঘ সামরিক শাসনামলে তাঁকে বহুবার কারাবরণ ও নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়েছে, কিন্তু তিনি তাঁর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।​পরবর্তীতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত সরকারে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে সফলভাবে কাজ করেছেন। ভোলা ও বরিশালের বিভিন্ন আসন থেকে তিনি মোট নয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।​২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জীবনের শেষ অধ্যায়ে তোফায়েল আহমেদকে বেশ কঠিন ও একাকী সময় পার করতে হয়েছে। বার্ধক্য ও অসুস্থতা তাঁকে রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। ২০২৫ সালে সহধর্মিণী আনোয়ার বেগমকে হারানোর পর তিনি মানসিকভাবে আরও ভেঙে পড়েন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে তিনি হাসপাতালের আইসিইউ এবং লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অবশেষে ১ জুন বিকেলে তাঁর দীর্ঘ লড়াইয়ের অবসান ঘটে।মৃত্যুকালে তিনি তাঁর একমাত্র কন্যা, জামাতা (হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. তৌহিদুজ্জামান তুহিন) এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী ও রাজনৈতিক অনুসারী রেখে গেছেন। ধানমণ্ডির তাকওয়া মসজিদে তাঁর প্রথম জানাজা, ভোলা সরকারি স্কুল মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে মরদেহ ভোলার নিজ গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয় শেষ শয্যার উদ্দেশ্যে। সেখানে তৃতীয় জানাজা শেষে তোফায়েল আহমেদকে তাঁর নিজ গ্রাম ভোলার সদর উপজেলার কোড়ালিয়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।​ তিনি তার জীবদ্দশাতেই ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন যেন মৃত্যুর পর তাঁকে তাঁর প্রিয় বাবা মৌলভী আজহার আলী এবং মা ফাতেমা খানমের কবরের পাশেই সমাহিত করা হয়। তাঁর সেই শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী বাবা-মায়ের কবরের পাশেই এই মহান নেতাকে চিরদিনের জন্য শায়িত করা হয়েছে।বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস তোফায়েল আহমেদকে ছাড়া অসম্পূর্ণ। তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা চড়াই-উতরাই, সমালোচনা ও বিতর্ক থাকলেও, ‘৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের মহানায়ক এবং ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির ঘোষক হিসেবে বাঙালির হৃদয়ে তাঁর স্থান চিরস্থায়ী। একটি তূর্যকণ্ঠের নীরবতার মধ্য দিয়ে শেষ হলো বাংলাদেশের রাজনীতির এক অনন্য রূপকথার।

ফেসবুকে লাইক দিন