আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে চান? - বিস্তারিত
  • বুধবার, ২০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩রা জুন, ২০২৬ ইং, ১৫ই জিলহজ্জ, ১৪৪৭ হিজরী

লাশের দুর্গন্ধ নয়, এ যে আমাদের সভ্যতার পচনের তীব্র গন্ধ!

লাশের দুর্গন্ধ নয়, এ যে আমাদের সভ্যতার পচনের তীব্র গন্ধ!
//মো: আশরাফুল আলম//
রাত গভীর হলে শহরের আলো ঝলমলে অট্টালিকাগুলোকে খুব গর্বিত মনে হয়। কাঁচের দেয়াল, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ, দামি গাড়ি আর প্রতিষ্ঠার অহংকারে মোড়া মানুষগুলোকে দেখলে মনে হয়—সভ্যতা বুঝি তার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে গেছে। কিন্তু মাঝেমধ্যে কোনো একটি ঘটনা সেই চকচকে মুখোশ ছিঁড়ে আমাদের প্রকৃত চেহারাটা সামনে এনে দেয়।মিরপুরের একটি ফ্ল্যাটে ৭২ বছর বয়সী নুরজাহান বেগমের পচাগলা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি তেমনই একটি আয়না। সেখানে আমরা শুধু একজন বৃদ্ধা মায়ের করুণ মৃত্যু দেখিনি; দেখেছি আমাদের মানবিকতার মৃত্যু, পারিবারিক বন্ধনের মৃত্যু, বিবেকের মৃত্যু।
ভাবতে অবাক লাগে, যে মা একসময় সন্তানের জ্বরের রাতে নিজের চোখের ঘুম বিসর্জন দিয়েছেন, সেই মা মৃত্যুর পর সাত-আট দিন ঘরে পড়ে থাকলেন, অথচ কেউ খোঁজ নিল না। তাঁর শরীরে পোকা ধরল, ঘরজুড়ে দুর্গন্ধ ছড়াল, কিন্তু সন্তানের ব্যস্ত জীবনে মায়ের জন্য কয়েকটি মুহূর্তও বরাদ্দ ছিল না।এটি কোনো একক ঘটনা নয়; বরং আমাদের সময়ের সবচেয়ে ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধির প্রতিচ্ছবি।
কয়েক বছর আগে দেশের একটি রেলস্টেশনে এক বৃদ্ধাকে পাওয়া গিয়েছিল। তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে ছিলেন একটি বেঞ্চে। আশপাশের মানুষ জানতে চাইলে বলেছিলেন, ছেলে তাকে এখানে বসিয়ে রেখে বলেছিল, “মা, একটু অপেক্ষা করো, আমি টিকিট কেটে আসছি।”সেই ছেলে আর ফিরে আসেনি।দিন গড়িয়ে রাত হয়েছে, রাত গড়িয়ে সকাল হয়েছে, তবুও মা বিশ্বাস করেছিলেন—”আমার ছেলে আসবেই।”মায়েরা এমনই হয়। সন্তান তাদের হৃদয় ভেঙে চুরমার করলেও তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সন্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারেন না।এক সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক একবার বলেছিলেন, সবচেয়ে কষ্টের দৃশ্য হলো এমন বৃদ্ধ বাবা-মাকে দেখা, যাদের সন্তানরা হাসপাতালে ভর্তি করে নিজের মোবাইল নম্বরটুকুও বন্ধ করে দেয়।বাবা আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন, আর সন্তান বিদেশে কিংবা নিজের ব্যবসায় ব্যস্ত।চিকিৎসকরা তখন রোগীর স্বজন খুঁজে বেড়ান। মৃত্যুর পর লাশ গ্রহণ করার মতো মানুষও পাওয়া যায় না।যে মানুষটি একদিন সন্তানের স্কুলের ফি দিতে নিজের ওষুধ কেনা বন্ধ করেছিলেন, শেষ যাত্রায় তার পাশে দাঁড়ানোর সময়টুকুও সন্তানের থাকে না।বৃদ্ধাশ্রমে থাকা এক মা প্রতিবার ঈদের সকালে সাজগোজ করে বসে থাকতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, আজ হয়তো ছেলে আসবে।প্রতিবার বিকেল হতো, সন্ধ্যা নামত, রাত হতো।ছেলে আসত না।পরদিন তিনি আবার অন্য মায়েদের বলতেন, “ছেলেটা খুব ব্যস্ত। না হলে নিশ্চয়ই আসত।”সন্তানকে দোষ না দিয়ে নিজের কষ্টটুকু গোপন করার এই নামই তো মা।সমাজে এমন অসংখ্য ঘটনা আছে যেখানে বৃদ্ধ বাবা-মা জীবনের সমস্ত সম্পত্তি সন্তানদের নামে লিখে দেওয়ার পরই তাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়।যে বাবার স্বাক্ষর একসময় সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়েছিল, সেই বাবার স্বাক্ষরই একদিন তাকে নিজের ঘর থেকে উচ্ছেদ করার অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়।কোথাও মাকে বারান্দার একটি কোণে ঠাঁই দেওয়া হয়, কোথাও আলাদা প্লেটে খাবার দেওয়া হয়, কোথাও আবার তাকে “বোঝা” বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।সম্পত্তি হস্তান্তরের দিন থেকে যেন সম্পর্কেরও মৃত্যু ঘটে।আজ আমরা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংযুক্ত।ভিডিও কল আছে, মেসেঞ্জার আছে, হোয়াটসঅ্যাপ আছে।তবুও বাবা-মা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি একা।কারণ প্রযুক্তি দূরত্ব কমিয়েছে, কিন্তু হৃদয়ের দূরত্ব কমাতে পারেনি।সন্তান হাজার মানুষের পোস্টে লাইক দেয়, শত বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে, কিন্তু মায়ের নম্বরটি ডায়াল করার সময় খুঁজে পায় না।মায়ের সঙ্গে পাঁচ মিনিট কথা বলার সময় নেই, অথচ সামাজিক মাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানোর সময় আছে।আজ আমরা সন্তানদের ডাক্তার বানাতে চাই, ইঞ্জিনিয়ার বানাতে চাই, বিসিএস ক্যাডার বানাতে চাই।কিন্তু আমরা কি তাদের শেখাচ্ছি—”মা অসুস্থ হলে তার পাশে বসতে হয়? বাবা বৃদ্ধ হলে তার হাত ধরে হাঁটতে হয়?মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার পদবি নয়, তার মানবিকতা? শিক্ষা যদি কেবল অর্থ উপার্জনের উপায় শেখায়, কিন্তু কৃতজ্ঞতা শেখাতে না পারে, তবে সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ। একজন অশিক্ষিত রিকশাচালকও হয়তো বৃদ্ধ মাকে নিজের সঙ্গে রাখেন; আবার একজন উচ্চশিক্ষিত কর্মকর্তা মায়ের খবর নিতে ভুলে যান।তাই ডিগ্রি মানুষের যোগ্যতার প্রমাণ হতে পারে, কিন্তু মনুষ্যত্বের নয়। আজকের শিশু, আগামীর আয়নাআমরা এই সত্যটি প্রায়ই ভুলে যাই। আমাদের সন্তানরা আমাদের কথা যতটা শোনে, তার চেয়ে বেশি আমাদের কাজ দেখে।আজ যদি একটি শিশু দেখে তার বাবা নিজের বৃদ্ধ মায়ের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছে, তাহলে আগামীকাল সেই শিশুও একই আচরণ শিখবে। আজ আমরা যেভাবে আমাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে আচরণ করছি, আগামী প্রজন্মও আমাদের সঙ্গে সেভাবেই আচরণ করবে।জীবন আসলে একটি আয়না। যা দিই, একদিন তাই ফিরে আসে।নুরজাহান বেগমের মরদেহ হয়তো মাটির নিচে শায়িত হয়েছে, কিন্তু তার নীরব প্রশ্নটি এখনো বাতাসে ভাসছে—সন্তান মানুষ করেছিলাম কেন?সম্ভবত এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের কারও কাছে নেই।আমরা উন্নয়নের গল্প বলি, স্মার্ট সিটির স্বপ্ন দেখি, প্রযুক্তির জয়গান গাই। কিন্তু যে সমাজে একজন মা মৃত্যুর পর দিনের পর দিন পড়ে থাকেন, যে সমাজে বৃদ্ধ বাবা-মা সন্তানের অপেক্ষায় দরজার দিকে তাকিয়ে জীবন কাটান, সে সমাজ সত্যিকার অর্থে কতটা উন্নত—সেই প্রশ্নের উত্তর আমাদের বিবেককেই দিতে হবে।আজ রাতে ঘুমানোর আগে একবার শুধু মায়ের নম্বরটিতে ফোন দিন।বাবার পাশে গিয়ে পাঁচ মিনিট বসুন।কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর অনুতাপ হলো—যখন খোঁজ নেওয়ার সময় ছিল, তখন খোঁজ না নেওয়া।
আর সবচেয়ে বড় শোক হলো—যখন ডাকতে চাই, তখন আর “মা” বলে ডাকার মতো কেউ থাকে না।নুরজাহান বেগম হয়তো পরপারে চলে গেছেন, মুক্তি পেয়েছেন এই নির্মম অবহেলা থেকে। কিন্তু তিনি আমাদের জন্য রেখে গেছেন এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন। আজ রাতে ঘুমানোর আগে আমাদের প্রত্যেকের নিজেকে একবার প্রশ্ন করা উচিত—আমরা আমাদের বাবা-মায়ের খোঁজ শেষ কবে নিয়েছি? আমাদের ঘরের ভেতরেও কি কোনো মা নীরবে কাঁদছেন না তো?

ফেসবুকে লাইক দিন