আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে চান? - বিস্তারিত
  • বুধবার, ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে মে, ২০২৬ ইং, ৮ই জিলহজ্জ, ১৪৪৭ হিজরী

হামের প্রাদুর্ভাব ও আমাদের সামগ্রিক দায়

হামের প্রাদুর্ভাব ও আমাদের সামগ্রিক দায়
//মো: আশরাফুল আলম //
​একটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আসল কঙ্কালটা বেরিয়ে পড়ে তখনই, যখন খুব সাধারণ এবং শতভাগ নিরাময়যোগ্য কোনো রোগে শিশুদের লাশ পড়তে থাকে। বাংলাদেশ একসময় বিশ্বজুড়ে শিশু টিকাদানের (ইপিআই) এক অনন্য রোল মডেল ছিল। সেই দেশেই যখন আজ হাম ও হামের উপসর্গে শত শত শিশুর মৃত্যুর খবর আসে, হাজার হাজার শিশু হাসপাতালে কাতরায়, তখন বুকটা কেঁপে ওঠে। এই নিষ্পাপ শিশুরা কেন সুরক্ষা পেল না? এই ব্যর্থতা আসলে কার?
​এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কোনো একক পক্ষকে দোষ দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলার সুযোগ নেই। এখানে ব্যর্থতা আমাদের সামগ্রিক ব্যবস্থার। জনস্বাস্থ্যের একটি সোনালী নিয়ম হলো—অর্জন ধরে রাখতে হয় প্রতিদিন। একসময় আমরা সফল ছিলাম বলেই ভবিষ্যৎ চিরকাল নিরাপদ থাকবে, এমন অলীক ভাবনায় বিভোর থাকাটাই ছিল প্রথম ভুল। ২০২০ সালের পর থেকে দেশে নিয়মিত অতিরিক্ত হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং দুর্গম অঞ্চল বা শহরের বস্তির সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কাছে সময়মতো টিকা না পৌঁছানো দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। অতীতের সেই অবহেলার মাশুলই আজ জাতি দিচ্ছে।​কিন্তু একই সঙ্গে বর্তমান প্রশাসনের দায়ও এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। টিকার ঘাটতি এবং তা কেনাকাটার সিদ্ধান্ত নিতে যে আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি ও রশি টানাটানি হয়েছে, তা রীতিমতো অপরাধের শামিল। জনগণের টাকা সাশ্রয় করা বা সরাসরি ক্রয়ের মাধ্যমে স্বচ্ছতা আনা অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে—টিকা কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্য নয়। এটি কিনতে আগাম পরিকল্পনা, বিশেষায়িত কোল্ড-চেইন এবং আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস লাগে। সরাসরি কিনতে গিয়ে বা ফি-এর হিসাব মেলাতে গিয়ে যদি ফাইলের টেবিলে কয়েক মাস সময় নষ্ট হয় এবং সেই সুযোগে টিকার মজুত ফুরিয়ে যায়, তবে সেই আর্থিক সাশ্রয়ের খতিয়ান শেষ পর্যন্ত শিশুর লাশের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়। আমলাতন্ত্রের কাগজের সামান্য দেরি যে বাস্তবে কত বড় মানবিক বিপর্যয় ঘটাতে পারে, এটি তার জ্বলন্ত উদাহরণ।​আবার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বিশেষ করে ইউনিসেফের ভূমিকাও এখানে প্রশ্নাতীত নয়। তারা দাবি করছে যে তারা বারবার চিঠি দিয়ে সতর্ক করেছিল। কিন্তু সেই সতর্কবার্তার ভাষা কতটা জোরালো ছিল? তা কি কেবলই রুটিনমাফিক দাপ্তরিক যোগাযোগ ছিল, নাকি আসন্ন মহামারির স্পষ্ট চিৎকার ছিল? উন্নয়ন সহযোগীরা কেবল বাইরের দর্শক নন, তারা এই কর্মসূচির অংশীদার। তাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।​আমাদের এখন একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং সম্পূর্ণ নথিভিত্তিক তদন্ত প্রয়োজন। কে কাকে চিঠি দিল, কে ফাইল আটকে রাখল, কোন সিদ্ধান্তের কারণে শিশুরা টিকা থেকে বঞ্চিত হলো—তার পুঙ্খানুপুঙ্খ সত্য বেরিয়ে আসতে হবে। এই শিশুদের মৃত্যু কোনো রাজনৈতিক বিতর্কের বা কাদা ছোঁড়াছুড়ির বিষয় হতে পারে না। তারা রাষ্ট্রের কাছে শুধু একটি অধিকার চেয়েছিল—সময়মতো টিকা পাওয়ার অধিকার। যে শিশুরা চলে গেছে, তাদের আমরা আর ফিরিয়ে আনতে পারব না। কিন্তু সত্যটা জানা দরকার কোনো প্রতিশোধের জন্য নয়, ভবিষ্যতের শিশুদের সুরক্ষার দেয়াল শক্ত করার জন্য। জনস্বাস্থ্যে একটি ফাইল দেরিতে সরানো কিংবা একটি সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করার মানেই যে শিশুর মৃত্যু, এই নির্মম সত্যটা আমাদের প্রশাসন যত দ্রুত বুঝবে, দেশের ভবিষ্যৎ তত দ্রুত নিরাপদ হবে।

ফেসবুকে লাইক দিন