আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে চান? - বিস্তারিত
  • সোমবার, ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৫শে মে, ২০২৬ ইং, ৬ই জিলহজ্জ, ১৪৪৭ হিজরী

বাল্যবিবাহের সামাজিক বাস্তবতা ও আমাদের দায়

বাল্যবিবাহের সামাজিক বাস্তবতা ও আমাদের দায়
​//মো:আশরাফুল আলম//
​প্রতিদিন ভোরে যখন সুর্য ওঠে, তখন বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৫ হাজার মেয়ের জীবন থেকে শৈশবের আলো চিরতরে হারিয়ে যায়। ইউনিসেফের বৈশ্বিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি বছর প্রায় ৯০ লক্ষ মেয়ে পরিণত বয়সে পৌঁছানোর আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হচ্ছে। নাইজার, চাদ বা সুদানের মতো চরম যুদ্ধ ও দারিদ্র্যপীড়িত দেশগুলোর তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ উদীয়মান অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশের নামও জড়িয়ে আছে এই লজ্জাজনক বাস্তবতার সাথে। বাংলাদেশে আইনত মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ বছর হলেও, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন জরিপ বলছে—এ দেশে এখনও প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। গ্রামীণ অঞ্চলে এবং প্রান্তিক জনপদে এই হার আরও অনেক বেশি। কোভিড-১৯ মহামারির ধাক্কা, অর্থনৈতিক মন্দা, এবং সাম্প্রতিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বাস্তুচ্যুতি এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। মহামারি ও পরবর্তী সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এবং পারিবারিক দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাওয়ায় হাজারো কিশোরীর খাতা-কলমের জায়গা দখল করেছে রান্নার হাঁড়ি আর সংসারের বোঝা।বাংলাদেশ সরকার ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭’ প্রণয়ন করেছে, জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক করেছে এবং মেয়েদের শিক্ষার হার বাড়াতে উপবৃত্তি চালু করেছে; কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সমাজবিজ্ঞান ও আচরণগত তত্ত্ব বা ‘Theory of Planned Behavior’ অনুযায়ী, অনেক সময় কোনো বিষয়ে ব্যক্তিগত সচেতনতা থাকলেও সামাজিক চাপ বা ‘Subjective Norm’ তথা সমাজ কী ভাববে—এমন চিন্তার কাছে পরিবার নতি স্বীকার করে। আমাদের সমাজে এখনও মেয়েদের ‘অর্থনৈতিক বোঝা’ বা ‘পরের ধন’ হিসেবে দেখার মানসিকতা পুরোপুরি দূর হয়নি। এর সাথে যুক্ত হয়েছে প্রাচীন যৌতুক প্রথা ও সামাজিক নিরাপত্তা বা সম্মান রক্ষার মনস্তাত্ত্বিক চাপ। অনেক বাবা-মা মনে করেন, মেয়ে বড় হলে ‘নিরাপত্তাহীনতা’ বা ইভটিজিংয়ের শিকার হতে পারে, তাই দ্রুত বিয়ে দেওয়াই একমাত্র সমাধান। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় পর্যায়ের কিছু দুর্নীতি ও অসচেতনতা। টাকার বিনিময়ে ভুয়া জন্মনিবন্ধন তৈরি করা, কাজি বা ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে গোপনে বিয়ে পড়ানো এবং স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের নীরবতা আইনকে কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রাখছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা ও প্রশাসনকে কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।​নারীবাদী তত্ত্ব বা ‘Feminist Theory’ অনুযায়ী, বাল্যবিবাহ আসলে নারীর ওপর পুরুষের এবং পিতৃতান্ত্রিক সমাজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার একটি হাতিয়ার। আর মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ বা ‘Human Rights Theory’ থেকে এটি শিশুর শিক্ষা, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার মতো মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন। বাল্যবিবাহের ফলে একটি মেয়ের জীবনে যে ক্ষতি হয়, তা বহুমাত্রিক ও অপরিবর্তনীয়। অল্প বয়সে গর্ভধারণের কারণে কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁких মুখে পড়ে, যার ফলে মাতৃমৃত্যু ও শিশু মৃত্যুর হার বাড়ে। একই সাথে শিক্ষাজীবন স্তব্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা সারাজীবন অর্থনৈতিকভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল থেকে যায়। এই নির্ভরশীলতা দারিদ্র্যের কুৎসিত চক্রকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান রাখে। সর্বোপরি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীকে যদি কৈশোরেই গৃহবন্দী করে ফেলা হয়, তবে জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জন করা কখনোই সম্ভব নয়। যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও শরণার্থী সংকট এই পরিস্থিতিকে বৈশ্বিকভাবে আরও জটিল করে তুলছে; সিরিয়া, ইয়েমেন ও রোহিঙ্গা শিবিরের অভিজ্ঞতা দেখায় যে, নিরাপত্তাহীনতার অজুহাতে বাল্যবিবাহ বাড়লেও বাস্তবে তা শিশুদের আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়।​কেবল পুলিশ পাঠিয়ে বা ভয় দেখিয়ে বাল্যবিবাহের সামাজিক ব্যাধি দূর করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন মানুষের আচরণগত এবং মানসিকতার রূপান্তর বা ‘Social Marketing Theory’। বিশ্বজুড়ে এর সফল উদাহরণ রয়েছে, যেমন নরওয়ের প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের “Thea’s Blog” প্রচারণা, যেখানে একটি ১২ বছরের কাল্পনিক কিশোরীর বিয়ের ব্লগ তৈরি করে বিশ্বজুড়ে তীব্র জনমত ও আবেগ তৈরি করা হয়েছিল। বাংলাদেশেও আমাদের গল্পভিত্তিক যোগাযোগ, পথনাটক, শর্ট ফিল্ম এবং সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে এমন জোরালো সামাজিক বিপণন কৌশল গ্রহণ করতে হবে। উদ্ভাবনের প্রসারণ তত্ত্ব বা ‘Diffusion of Innovation Theory’ অনুযায়ী, সমাজের যেকোনো পরিবর্তনের জন্য কিছু ‘আর্লি অ্যাডপ্টার’ বা পথপ্রদর্শকের প্রয়োজন হয়। আমাদের গ্রামীণ সমাজে শিক্ষক, ইমাম, পুরোহিত এবং স্থানীয় নেতৃবৃন্দ হলেন সেই প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। জুমার খুতবায় বা ধর্মীয় সভায় যদি বাল্যবিবাহের কুফল এবং ধর্মীয় ব্যাখ্যার অপব্যবহার রোধে আলোচনা করা হয়, তবে সাধারণ মানুষের মানসিকতায় দ্রুত পরিবর্তন আসবে।​অবশেষে বলা যায়, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে একক কোনো জাদুকরী সমাধান নেই। আইন, শিক্ষা, অর্থনৈতিক সহায়তা, নারীর নিরাপত্তা, স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহি এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনসহ সব ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত ও সুসংহত উদ্যোগ প্রয়োজন। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ‘বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটি’ কাগজ-কলমে না রেখে বাস্তবে সক্রিয় করতে হবে এবং সরকারের ‘৩৩৩’ বা ‘১০৯’ হেল্পলাইনের প্রচার আরও বাড়িয়ে দ্রুত প্রশাসনিক সাড়া নিশ্চিত করতে হবে। সেই সাথে প্রতিটি গ্রামে কিশোরী ক্লাব গঠন করে মেয়েদের আত্মরক্ষা ও অধিকার বিষয়ে সচেতন করা জরুরি। একটি মেয়ের শৈশব, তার শিক্ষা আর তার স্বাধীনতা রক্ষা করা মানে শুধু একজন ব্যক্তির উন্নয়ন নয়; এটি একটি পুরো জাতির ভবিষ্যৎ এবং টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি। কন্যাশিশুরা দেশের বোঝা নয়, বরং দেশের সম্পদ—এই সত্যটি হৃদয়ে ধারণ করে আমাদের সবাইকে আজ এক হয়ে দাঁড়াতে হবে।

ফেসবুকে লাইক দিন