খেজুর রস আর শৈশবের অমলিন স্বাদ- মহিউদ্দিন মহিন

নিউজ ডেস্ক: কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাস এলেই আমাদের নাছির মাঝি এলাকায় যেন এক অন্যরকম প্রাণচাঞ্চল্য নেমে আসত। শীতের আগমনী হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যেত খেজুর গাছ কাটার প্রস্তুতি। আমাদের গ্রামে যাঁরা এই কাজ করতেন গাছালি তাঁদের আমরা স্থানীয় ভাষায় বলি — শিয়ালি।
এই সময় আমি দেখতাম আমার চাচাতো ভাই ইসমাইল, মোছলেউদ্দিন, সেলিম ভাই দাদা সামছল হক প্রতিবেশী মালেক, শহিদ, মোস্তফা, রহম আলী, কালু পণ্ডিত—এঁরা সবাই মিলে প্রস্তুতি নিচ্ছেন খেজুর গাছ কাটার জন্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ ছিল ধারালো দা। সেই দা বানানোর জন্য তাঁরা যেতেন কালীনাথ রায়ের বাজারে, কামারের দোকানে। বিশেষ করে সৈয়দ কামারের দোকানটি ছিল আমাদের এলাকায় সুপরিচিত। শক্ত ইস্পাতের তৈরি তাঁর বানানো দা গুলো ছিল অসম্ভব ধারালো। আমাদের স্থানীয় ভাষায় সেই দাকে বলা হতো— গাছ কাটা কাটাইল।
দা ধার দেওয়ার জন্য যে বিশেষ যন্ত্রটি তৈরি করা হতো, তাকেও আমরা আমাদের ভাষায় বলতাম— বালুকড়চা। এটি গাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে, তার ওপর করাতে বালু ছড়িয়ে দায়ে ধার দেওয়া হতো। উপরে-নিচে টেনে টেনে ধার করা হতো। গায়ের লোম কাটতে পারলেই বোঝা যেত—দা ক্ষুরোধার হয়েছে।
কালীনাথ রায়ের বাজার থেকেই কেনা হতো বাঁশের তৈরি বিশেষ থলে, যাকে আমরা বলতাম বাঁশের খুলি। এই খুলির ভেতর ভরা হতো খেজুর গাছ কাটার সব সরঞ্জাম। খেজুরের ডগা হেতলিয়ে বানাতেন বিশেষ ঝাড়ু আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় আমরা বলিন- ছিপি।কেউ কেউ নারিকেলের সলা দিয়ে বানাতেন এই বিশেষ ঝাড়ু, এ ঝাড়ু দিয়েই পরিষ্কার হয় খেজুর গাছের কাঁটা মাথা, এ কাটা মাথাকে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় আমরা বলি– খাজুর গাছের খলা। বাঁশ দিয়ে তৈরি হয় রস ঝরার চুঙ্গি, চিকন করে কেটে বানানো হয় ছোট ছোট খুঁটি। তেঁতুল গাছের ডাল দিয়ে তৈরি হয়- মুগুর, আর পাট দিয়ে বানানো মোটা রশিকে বলা হয় গাছকাটা কাছি—যা কোমরে বেঁধে শিয়ালিগণ তরতর করে খেজুর গাছে বেয়ে উঠতেন।
খেজুর গাছে ওঠার জন্য গাছের গায়ে বিশেষভাবে কেটে বানানো হয় ধাপ—যেগুলো আমাদের ভাষায় পরিচিত খেজুর গাছের- থাক নামে। এই থাক বেয়েই শিয়ালিগণ অনায়াসে উঠে পড়েন গাছের মাথায়।
কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসে খেজুর গাছের পুরোনো ডগা কেটে পরিষ্কার করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ে গাছের মাথার একদিকে কাটাইল ধরে, তেঁতুল কাঠের মুগুর দিয়ে ঠুকঠুক শব্দ তুলে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কাট দেওয়া হয়। সেই কাটে ত্রিভুজ একটি বিশেষ আকৃতি তৈরি করা হয়। দুই পাশে ছোট্ট ড্রেন করে দেওয়া হয় রস আসার জন্য। ড্রেনের নিচে বসানো হয় বাঁশের চুঙ্গি। দুই পাশে বাঁশের খুঁটি পুঁতে ঝুলিয়ে রাখা হয় মাটির হাঁড়ি।
কিছুদিন অপেক্ষার পর শুরু হয় রস ঝরা। প্রথমদিকে রস হয় ঘোলাটে ও কষযুক্ত। কিন্তু শীত যত বাড়ে, রাত যত ঠান্ডা হয়, রস তত পরিষ্কার, তত সুমিষ্ট হয়ে উঠে। সপ্তাহে চার দিন গাছ কাটার পর দুই দিন বন্ধ রাখা হয়—এই বিরতিকে আমরা বলি– গানি দেওয়া।
গানি দেওয়ার প্রথম দিনের রস হয় লালচে, টকটকে ও অসাধারণ মিষ্টি। সেই রস দিয়ে তৈরি হয় রসের ফিন্নি—আমাদের শৈশবের এক অনন্য স্বাদ। আহা! কী তার গন্ধ, কী তার স্বাদ! ওই দিনের রস দিয়ে বানানো গুড়ের স্বাদও ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
অনেক সময় আমরা রস জ্বাল দিয়ে লাল রস গ্লাসে ঢেলে চায়ের মতো করে খেতাম। তখনকার দিনে আজকের মতো চা খাওয়ার প্রচলন ছিল না; খেজুর রসই ছিল আমাদের শীতের চা। রসের সঙ্গে কালিজিরা সুগন্ধি চাল দিয়ে তৈরি হতো ফিরনি-পায়েস—যাকে আমরা বলতাম রসের নাস্তা।
রসের ফিন্নি রান্না হতো চুলায়। চাউল একটু ফুটলেই নারিকেলের টগ্গি দিয়ে নামিয়ে খাওয়া শুরু করতাম। রান্নার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্বাদের নানা স্তর তৈরি হতো। নারিকেল কোরানোর যন্ত্রকে বলা হয় নারিকেলের কোরানি—একটি বাঁকা কাঠে ধাতব ফলার সংযোজন।
ফিন্নির সঙ্গে তেজপাতা, চিনাবাদাম, কিশমিশ, এমনকি মহিষের দধি দিলে তার স্বাদ বহুগুণ বেড়ে যায়। আবার কখনো পেঁয়াজে ভাজা পাঁচফোড়ন দিলে স্বাদে আসত এক ভিন্ন মাত্রা। শৈশবে আমরা কত রকমভাবে যে রসের ফিন্নি খেয়েছি—তার হিসাব নেই।
রস জ্বাল দেওয়ার জন্য তৈরি হতো বড় চুলা—আমাদের ভাষায় গুইল্লা। সেখানেই তৈরি হতো খেজুর রস তাওয়ায় করে গুইল্লায় জ্বাল দিয়ে ব্যবসায়িক খেজুরের গুড়। গুড় নামানোর আগে দক্ষ কারিগরেরা পরীক্ষা করতেন গুড়ের– পোট দেখে। কখনো ডলনা দিয়ে ডলে পাটির ওপর ঢেলে বানানো হতো পাটালি গুড়।
তাওয়া থেকে গুড় পরিষ্কারের জন্য ব্যবহৃত সুপারির খুইকে বলা হয় –আতা। পাটালি গুড়ের সেই স্বাদ আজও আমার জিভে লেগে আছে। পাটালি গুড়কে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় আমরা বলি — বাডালি মিডাই। ঝোলা গুড় বড় কালো হাঁড়ি, কলসি বা মটকায় সংরক্ষণ করে রাখা হতো সারা বছরের জন্য।
অনেকদিন রাখা গুড়ের নিচে জমে উঠত চিনির মতো রোয়া—নারিকেলের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে তার তৃপ্তি ছিল অনন্য। কিছু খেজুর গাছে রস কম, আবার কিছু গাছে অঢেল রস হতো। বেশি রসের গাছে কালো রঙ্গের বড় হাঁড়ি অথবা মাটির কলসি বসানো হতো, তবু রস উপচে পড়ত।
আমাদের রান্নাঘরের পাশে পুকুরপাড়ে লম্বা দুইটি খেজুর গাছ ছিল—দিনে রাতে তিন-চারবার কলসি ভরে রস উপচে পড়ত। সেই গাছ কাটতে বিশেষ কৌশল ব্যবহার করা হতো। চুঙ্গির সঙ্গে নাইলন সুতা বেঁধে এক বুক নিচে গাছের উপর খুঁটি গেড়ে হাঁড়ি বসানো হতো।
ছোট আকারের শিয়ালের উৎপাত ছিল ভয়াবহ। ছোট গাছের হাঁড়ি ভেঙে রস খেয়ে ফেলত শিয়াল। পরে শিয়ালীগণ হাঁড়ির চারপাশে খেজুর কাঁটার ডগা বেঁধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতেন।
দুঃখের বিষয়, দেশে ব্যাপকভাবে জন্মানো রেন্ট্রি গাছ—আমাদের ভাষায় সৃষ্টিগাছ—এবং ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে খেজুর গাছ ব্যবহারের কারণে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে অমৃতস্বাদী খেজুর রসের সেই গাছগুলো। অনেক সময় অতিরিক্ত রসের লোভে গভীর কাট দেওয়ায় গাছ মরে গেছে।
আজ সেই দিন নেই, নেই সেই গাছ, নেই সেই শীতের রাত। কিন্তু স্মৃতির গভীরে আজও বেঁচে আছে নাছির মাঝির শীত, শিয়ালি, খেজুর রস আর শৈশবের অমলিন স্বাদ।
