আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে চান? - বিস্তারিত
  • শুক্রবার, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১৫ই মে, ২০২৬ ইং, ২৭শে জিলক্বদ, ১৪৪৭ হিজরী

শৈশবের দাঁত পড়া আর সাতবাড়ির চালের ভিক্ষা ( ১৯২ অধ্যায় )- মহিউদ্দিন মহিন

মহিউদ্দিন মহিন: শৈশবের স্মৃতিগুলো মানুষের জীবনে এমন এক অমূল্য সম্পদ, যা সময়ের স্রোতেও কখনো মুছে যায় না।
জীবনের বহু বাস্তবতা, দুঃখ-কষ্ট, ব্যস্ততা আর আধুনিকতার ভিড়েও হঠাৎ কোনো এক অলস বিকেলে ছোটবেলার কোনো ঘটনা মনে পড়লে ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে ওঠে। আমাদের শৈশবও ছিল এমন অসংখ্য সরলতা, বিশ্বাস, হাসি-কান্না আর লোকজ ঐতিহ্যে ভরা।
আজকের আধুনিক শিশুদের কাছে হয়তো এসব গল্প কল্পনার মতো মনে হবে, কিন্তু আমাদের কাছে সেগুলোই ছিল জীবনের সবচেয়ে নির্মল আনন্দের দিন।
আমাদের ছোটবেলায় যখন প্রথম দুধ দাঁত নড়তে শুরু করত, তখন যেন এক অদ্ভুত আতঙ্ক আর কৌতূহল একসঙ্গে কাজ করত। দাঁতটি একটু নড়লেই মনে হতো মুখের ভেতরে কী ভয়ংকর যন্ত্রণা! খাওয়া-দাওয়া করতে কষ্ট হতো, শক্ত কিছু কামড়াতে গেলে ব্যথায় চোখে পানি চলে আসত।
তখন তো ডেন্টিস্ট, ডেন্টাল ক্লিনিক কিংবা আধুনিক দাঁতের চিকিৎসার সঙ্গে আমাদের কোনো পরিচয়ই ছিল না। গ্রামের সহজ-সরল মানুষদের চিকিৎসা বলতে ছিল দাদী-নানীদের অভিজ্ঞতা, লোকজ টোটকা আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা গ্রামীণ বিশ্বাস।
আমাদের দাদী-নানীরা ছিলেন যেন চলমান অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার।
তারা কোনো বই পড়ে নয়, জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছিলেন মানুষের ছোটখাটো অসুখ-বিসুখের ঘরোয়া চিকিৎসা।
দাঁত নড়লে তারা খুব দক্ষতার সঙ্গে একটি চিকন নাইলনের সুতা দাঁতের গোড়ায় বেঁধে ফেলতেন। তারপর হঠাৎ এক ঝটকায় টান দিতেন। মুহূর্তের মধ্যেই দাঁতটি ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ত।
প্রথমে সামান্য ব্যথা লাগলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই ব্যথা মিলিয়ে যেত।
অনেক সময় রক্ত পড়ত, কিন্তু তাতেও তাদের কোনো ভয় ছিল না। বালিশের তুলা কিংবা শিমুল তুলা এনে দাঁতের জায়গায় পানি দিয়ে ভিজিয়ে চেপে ধরতেন। আশ্চর্যভাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই রক্ত বন্ধ হয়ে যেত।
আজ ভাবলে অবাক লাগে—সেই সময়ে গ্রামের বয়স্ক নারীরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে এসব কাজ করতেন! তাদের হাতে ছিল না কোনো চিকিৎসা যন্ত্র, ছিল না আধুনিক ওষুধ, কিন্তু ছিল অভিজ্ঞতার শক্তি আর স্নেহমাখা আন্তরিকতা।
তারা যেন পরিবারের শিশুদের ব্যথা নিজেদের হৃদয়ে অনুভব করতেন।
দাঁত তুলে ফেলার পর শুরু হতো আরেক মজার অধ্যায়। দাদী কিংবা নানীরা দাঁতটি হাতে দিয়ে বলতেন,
“যা, ইঁদুরের গর্তে দাঁত ফেলে আয়। আর এক নিঃশ্বাসে বল—
‘ইঁদুর ভাই, ইঁদুর ভাই,
আমার এই মোটা দাঁত নিয়ে
তোমার চিকন দাঁত আমাকে দাও।’”
আমরাও বিশ্বাসভরা মন নিয়ে হাতে ছোট্ট দাঁতটি নিয়ে ছুটে যেতাম বাড়ির আঙিনার পাশে অথবা ঘরের পীড়ার পাশে কোনো ইঁদুরের গর্তের কাছে। সেখানে দাঁড়িয়ে দাদীদের শেখানো সেই বুলি এক নিঃশ্বাসে বলতাম। তারপর দাঁতটি গর্তের ভেতরে ছুঁড়ে ফেলতাম।
মনে হতো সত্যিই বুঝি ইঁদুর এসে আমাদের নতুন দাঁত দিয়ে যাবে! শিশুমনের সেই সরল বিশ্বাস ছিল কত পবিত্র, কত নির্মল!
এরপর শুরু হতো নতুন দাঁত ওঠার অপেক্ষা। প্রতিদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা দেখতাম দাঁত উঠছে কিনা। নতুন দাঁত একটু একটু করে মাড়ি ফুঁড়ে বের হতে শুরু করলে কী যে আনন্দ লাগত! কিন্তু কখনো যদি দাঁত উঠতে দেরি হতো, তখন আবার শুরু হতো দাদী-নানীদের নতুন পরামর্শ।
তারা বলতেন,
“সাত বাড়ি থেকে এক মুঠো করে চাল ভিক্ষা করে আনো। সেই চাল একত্র করে গুঁড়ো বানিয়ে চিতই পিঠা খেলে দাঁত দ্রুত উঠে যাবে।”
এই কথাটিকে আমরা অদ্ভুত বিশ্বাস নিয়ে সত্য মনে করতাম। তখনকার গ্রামবাংলায় প্রতিবেশীদের মধ্যে ছিল অসাধারণ আন্তরিকতা ও হৃদ্যতা। আমরা সমবয়সী বন্ধুরা দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি যেতাম। ছোট্ট হাতে পাতিল কিংবা বাটি নিয়ে বলতাম—
“এক মুঠো চাল দেন।”
প্রতিবেশীরাও মমতা ভরা হাসি দিয়ে চাল দিতেন। কেউ এক মুঠো, কেউ দুই মুঠো। সাত বাড়ির চাল একত্র হলে মনে হতো যেন বিশাল কোনো সম্পদ জোগাড় করেছি। তারপর সেই চাল ধুয়ে শুকিয়ে গুঁড়ো করা হতো।
মায়েরা কিংবা দাদীরা সেই চালের গুঁড়ো দিয়ে বানাতেন ধোঁয়া ওঠা নরম চিতই পিঠা। মাটির চুলায় জ্বাল দেওয়া আগুনের গন্ধ, ধোঁয়ার মায়াবী আবরণ আর গরম পিঠার স্বাদ আজও যেন জিভে লেগে আছে।
কখনো আবার সেই চাল দিয়ে খোলা আকাশের নিচে খোয়াতি কিংবা চড়ুইভাতির আয়োজন হতো। আমরা শিশুরা দল বেঁধে উঠোনের একপাশে কিংবা গাছতলায় ছোট ছোট হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে রান্না করতাম।
কারো হাতে কাঁচা মরিচ, কারো হাতে পেঁয়াজ, কেউ আগুন জ্বালানোর দায়িত্বে। সেই রান্নায় হয়তো খুব বেশি স্বাদ ছিল না, কিন্তু আনন্দ ছিল সীমাহীন।
যাদের দাঁত উঠতে দেরি হচ্ছিল, তাদের নিয়ে সবাই মিলে খাওয়া হতো। মনে হতো এ যেন দাঁত ওঠার এক মহা উৎসব!
আজকের শিশুদের শৈশব প্রযুক্তির আলোয় ঘেরা।
তারা মোবাইল ফোন, ভিডিও গেম, কার্টুন আর ইন্টারনেটের জগতে ব্যস্ত। অথচ আমাদের শৈশব ছিল মাঠভরা হাসি, লোকজ বিশ্বাস, প্রতিবেশীদের ভালোবাসা আর সামান্য জিনিসে অপরিসীম আনন্দ খুঁজে পাওয়ার এক বিস্ময়কর সময়। তখন মানুষের মধ্যে সম্পর্ক ছিল হৃদয়ের, আত্মার।
এক বাড়ির সুখ-দুঃখ অন্য বাড়ির মানুষও অনুভব করত।
আজ আর সেই সাতবাড়ির চাল সংগ্রহের দৃশ্য দেখা যায় না। হারিয়ে গেছে সেই চিতই পিঠার আনন্দঘন আয়োজন। ইঁদুরের গর্তে দাঁত ফেলে নতুন দাঁত চাওয়ার সরল বিশ্বাসও আজ বিলীন হয়ে গেছে আধুনিকতার স্রোতে।
এখন দাঁত নড়লেই শিশুদের নিয়ে যাওয়া হয় আধুনিক ডেন্টাল ক্লিনিকে। চিকিৎসা অনেক উন্নত হয়েছে, জীবন হয়েছে সহজতর, কিন্তু কোথায় যেন হারিয়ে গেছে সেই আন্তরিকতা, সেই পারিবারিক উষ্ণতা আর লোকজ ঐতিহ্যের মায়া।
দাদী-নানীদের সেই টোটকা চিকিৎসাগুলো হয়তো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত ছিল না, কিন্তু সেগুলোর ভেতরে ছিল ভালোবাসা, স্নেহ আর শিশুদের মন ভালো রাখার এক আশ্চর্য ক্ষমতা। তারা আমাদের শুধু চিকিৎসাই দিতেন না, সাহসও দিতেন।
তাদের স্নেহমাখা কথায় ব্যথাও যেন অর্ধেক কমে যেত।
আজ সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রাও বদলে গেছে।
কিন্তু স্মৃতির ভাণ্ডারে সেই ছোট্ট দাঁত, ইঁদুরের গর্ত, সাতবাড়ির চাল, চিতই পিঠা আর চড়ুইভাতির দিনগুলো এখনো রঙিন হয়ে বেঁচে আছে।
কখনো একা বসে সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে বুকের ভেতর এক অদ্ভুত হাহাকার জেগে ওঠে। মনে হয়—আহা, যদি আরেকবার ফিরে পাওয়া যেত সেই সরল, নিষ্পাপ, আনন্দময় শৈশব!
আমাদের শৈশব ছিল অভাবের, কিন্তু হৃদয়ের দিক থেকে ছিল অফুরন্ত সম্পদের।
সেখানে ছিল ভালোবাসা, প্রতিবেশীর মায়া, পারিবারিক বন্ধন আর সামান্য ঘটনায়ও উৎসব খুঁজে পাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা।
সেই কারণেই হয়তো আজও শৈশবের এই ছোট ছোট স্মৃতিগুলো মনে পড়লে অজান্তেই হাসি পায়, আবার চোখের কোণেও জমে ওঠে একফোঁটা

ফেসবুকে লাইক দিন