আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে চান? - বিস্তারিত
  • সোমবার, ২৫শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ৯ই মার্চ, ২০২৬ ইং, ১৯শে রমযান, ১৪৪৭ হিজরী
সর্বশেষঃ

রমজানে ইফতার হোক স্বাস্থ্যকর: ভাজাপোড়া খাবারে লুকিয়ে থাকা স্বাস্থ্যঝুঁকি

হাকীম মোঃ রাজিউর রহমান

ডি.ইউ.এম.এস (ঢাকা) বিইউএমএস (ঢাকা)

রমজান মাস সংযম, আত্মশুদ্ধি ও ইবাদতের এক অনন্য সময়। দীর্ঘ সময় রোজা রাখার পর শরীরের প্রয়োজন হয় পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্যের। কিন্তু আমাদের সমাজে ইফতারের টেবিলে প্রায়ই দেখা যায় অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত ভাজাপোড়া খাবারের আধিক্য—যেমন বেগুনি, পেঁয়াজু, সমুচা, আলুর চপ ইত্যাদি। সাময়িকভাবে এসব খাবার সুস্বাদু হলেও নিয়মিত অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাওয়ার ফলে শরীরে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই রমজানে সুস্থ থাকতে ইফতারের খাবার নির্বাচন হতে হবে সচেতন ও স্বাস্থ্যসম্মত।

ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি

ভাজাপোড়া খাবারে সাধারণত অতিরিক্ত তেল, ক্যালরি ও লবণ থাকে। অতিরিক্ত ক্যালরি শরীরে জমে চর্বিতে রূপ নেয়, যার ফলে ধীরে ধীরে ওজন বৃদ্ধি পায়। রমজান মাসে অনেকের শারীরিক পরিশ্রম তুলনামূলকভাবে কম থাকে, ফলে এই অতিরিক্ত ক্যালরি সহজে পোড়ানো সম্ভব হয় না।

অতিরিক্ত লবণ শরীরে পানি ধরে রাখে। এর ফলে শরীরে পানি জমে সাময়িকভাবে ওজন বৃদ্ধি পেতে পারে এবং শরীর ভারী অনুভূত হয়।

 অতিরিক্ত পিপাসা পানিশূন্যতা

ভাজাপোড়া খাবারে লবণের পরিমাণ বেশি থাকায় শরীরের পানির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। এতে শরীরের কোষে পানির ঘাটতি তৈরি হয় এবং বারবার পিপাসা অনুভূত হয়।

রমজানে দীর্ঘ সময় পানি পান করা সম্ভব না হওয়ায় এই সমস্যা আরও বাড়তে পারে। যদি ইফতার থেকে সাহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি পান না করা হয়, তাহলে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। এর ফলে মাথা ঘোরা, ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভূত হতে পারে।

হজমের সমস্যা

অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার হজমে সমস্যা সৃষ্টি করে। ভাজাপোড়া খাবার নিয়মিত খেলে পাকস্থলীতে অ্যাসিডের পরিমাণ বেড়ে যায়, যার ফলে বুকজ্বালা, বদহজম ও অ্যাসিডিটির সমস্যা দেখা দেয়।

অনেক সময় খাবার খাওয়ার পর মনে হয় খাবার গলার দিকে উঠে আসছে। দীর্ঘদিন এ ধরনের খাদ্যাভ্যাস চলতে থাকলে পাকস্থলীর প্রদাহসহ বিভিন্ন হজমজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে।

শরীরে ক্ষতিকর চর্বি জমা

অতিরিক্ত ক্যালরি শরীরে জমতে থাকলে তা ধীরে ধীরে রক্তে ও রক্তনালির প্রাচীরে চর্বি হিসেবে জমা হয়। একই সাথে লিভার ও পেটের ভেতরের অঙ্গগুলোর আশপাশেও চর্বি জমতে শুরু করে, যা পরবর্তীতে ফ্যাটি লিভার রোগের কারণ হতে পারে।

এছাড়া পেটের মেদ বা ভুঁড়ি বৃদ্ধি পায়, যা দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

দীর্ঘমেয়াদি রোগের সম্ভাবনা

অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস দীর্ঘদিন চলতে থাকলে শরীরে নানা ধরনের দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ে। যেমন—

উচ্চ রক্তচাপ

ডায়াবেটিস

হৃদরোগ

স্ট্রোক

অতিরিক্ত তেল, চর্বি ও লবণযুক্ত খাবার এসব রোগের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত।

ইউনানী চিকিৎসার দৃষ্টিভঙ্গি

ইউনানী চিকিৎসা মতে মানুষের শরীরের সুস্থতা নির্ভর করে মিজাজ (Temperament) ও খাদ্যাভ্যাসের ভারসাম্যের উপর। অতিরিক্ত তেল ও ভাজাপোড়া খাবার শরীরে গরম ও শুষ্ক মিজাজ বৃদ্ধি করে, যার ফলে বদহজম, গ্যাস, অম্লতা এবং শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমার প্রবণতা বাড়ে।

প্রখ্যাত ইউনানী চিকিৎসাবিদ ইবনে সিনা তাঁর চিকিৎসা দর্শনে বলেছেন—

“পরিমিত ও সুষম খাদ্যই সুস্বাস্থ্যের মূল ভিত্তি।”

অতএব রমজানে সুস্থ থাকতে হলে খাদ্যে সংযম ও সঠিক খাদ্য নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভেষজ প্রাকৃতিক স্বাস্থ্যকর পরামর্শ

  • ইফতারের সময় কিছু ভেষজ ও প্রাকৃতিক খাবার শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী হতে পারে।

যেমন—

  • খেজুর: দ্রুত শক্তি জোগায় ও শরীরের ক্লান্তি দূর করে
  • লেবুর শরবত: শরীরকে সতেজ রাখে ও পানিশূন্যতা দূর করে
  • পুদিনা পাতা: হজমশক্তি বৃদ্ধি করে
  • ইসবগুলের ভুসি: কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে
  • টক দই: পাকস্থলীর জন্য উপকারী এবং হজমে সহায়ক
  • মৌসুমি ফল: শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ সরবরাহ করে

 

স্বাস্থ্যকর ইফতারের আদর্শ তালিকা

  • সুস্থ থাকার জন্য ইফতারে বেছে নেওয়া যেতে পারে—
  • খেজুর
  • চিড়া বা দই-চিড়া
  • শসা, গাজর ও সবজির সালাদ
  • মৌসুমি ফল
  • টক দই
  • লেবুর শরবত বা প্রাকৃতিক পানীয়

এই খাবারগুলো শরীরকে প্রয়োজনীয় শক্তি প্রদান করে এবং হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখে।

শেষ কথা

রমজান মাস আমাদের আত্মসংযম ও শৃঙ্খলার শিক্ষা দেয়। তাই ইফতারের খাবারেও সংযম বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবারের পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করলে শরীর থাকবে সুস্থ ও সতেজ। এর ফলে রোজা পালন যেমন সহজ হবে, তেমনি দৈনন্দিন কাজ ও ইবাদতও আরও স্বাচ্ছন্দ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

ফেসবুকে লাইক দিন