আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে চান? - বিস্তারিত
ঢাকা আজঃ শনিবার, ২৯শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৩ই জুলাই, ২০২৪ ইং, ৬ই মুহাররম, ১৪৪৬ হিজরী
সর্বশেষঃ

ভোলার চরঞ্চলে বসবাসরত এলাকাবাসীর হালচাল

ভোলার খবর ডেস্ক: বর্তমান ভোলা একদা বৃহত্তর বরিশাল জেলার একটি মহকুমা ছিল। ১৮৫৪ সালে দ্বীপটি মহকুমায় উন্নীত হয়। ১৯৮৪ সালে মহকুমা থেকে জেলার মর্যাদা পায়। আয়াতন ৩৪০৩.৪৮ বর্গ কিমি।
হিমালয় থেকে নেমে আসা ৩টি প্রধান নদী পদ্মা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র বাহিত পলি দিয়ে মোহনায় গড়ে উঠেছে এ দ্বীপ। সমুদ্র সমতল থেকে এর গড় উচ্চতা ১২ ফুটের মতো। নৃ-তত্ত্ব ও ভূ-তত্ত্ববিদরা মনে করেন পূর্ব দিকে মেঘনা ও পশ্চিম দিকে তেঁতুলিয়া নদী বঙ্গোপসাগরের মোহনায় এসে গতিবেগ হারিয়ে ফেলে। ফলে এ শামত্ম স্থানটিতে কালক্রমে পলি ও নদীতে বয়ে আসা বর্জ্য জমা হয়ে আজকের ভোলা নামক দ্বীপটির জন্ম।’
ভোলার জন্ম খুব বেশি দিনের নয়। আনুমানিক ১২৩৫ সালের দিকে দ্বীপটি গড়ে ওঠতে শুরু করে। এখানে প্রথম চর পড়া শুরু হয় ১২৩৫ সালের দিকে এবং ১৩০০সালের দিকে চাষাবাদ শুরু হয়। কালাক্রমে জেলার ভুখন্ডটি মেঘনা ও তেতুলিয়ার ভাঙ্গনে পরে শত শত মানুষ গৃহহীন হয়ে পরে। পরবের্তীতে ঢালচর, তারুয়া ও চরকুকরী মুকরী নামে অসংখ্য চর জেগে ওঠে। ধীরে ধীরে এখানকার জনগোষ্ঠী নুতন করে বসবাস শুরু করে। তাদের আর্থ-সামজিক অবস্থা এবং জীবন-যাত্রা প্রতিনিয়ত মানবেতরভাবে অতিক্রম করছে।
একেকটা দুর্যোগ আসে আর গ্রাম আরও ক্ষয়ে যায়। সেই ক্ষয়গ্রস্ত গ্রাম তখন আর তার মানুষগুলোকে ধরে রাখতে পারে না, তারা হয় দেশান্তরী। যাদের কাছে ঘর হইতে আঙিনাই বিদেশ তারাও শহর-নগর-বন্দরে ভিড় জমায়। ভাসতে ভাসতে ইহকালে তাদের শেষ মঞ্জিল বস্তি ও ফুটপাতে এসে ঠেকে। তখন আর বোঝার উপায় থাকে না, ঘর-ফসল-মাঠ-বৃক্ষ-এদের পতন গ্রামের পতন, কৃষির পতন। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একান্ত ইচ্ছার কারণে কৃষি ক্ষেত্রে আমরা অনেক এগিযয়ে গেছি এর মূলে রয়েছে চর অঞ্চলের কৃষকদের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি। কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ সকল মানুষ এখনও নানাবিধ সুযোগ সুবিধার বাইরে। একদিন ভোলার চর কুকরি মুকরি আইলের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেলাম একটি কুঁড়েঘরে দিকে। সেখানে কথা হয় জান্নাত বেগম (৩৫) এর সাথে। চরের নানা বিষয়ে প্রশ্ন করতেই কান্নায় জড়িত কন্ঠে শাহিনুর বলেন, ঝড় বাদল আইলে আমাগো অনেক কষ্টের মইধ্যে থাকতে হয়। জন্মের দুই দিনের মাথায় আমার সন্তান বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে। কোন চিকিৎসা পাই নাই ডায়রিয়া হলে মরণ ছাড়া আমাগো উপায় নাই। খেয়া পার হয়ে শহর পর্যন্ত যেতে অনেক রোগী পথেই মারা যায়। অভাব অনটনের সংসারে কেউ অসুস্থ্য হলে চিকিৎসা খরচ মিটাতে বছরের খোরাক ঘরের চাউল বেঁচে দিতে হয়। নদীতে মাছ শিকার করতে গিয়ে স্বামী মারা গেছে তিন বছর হয়েছে।
একটু এগিয়ে গিয়ে কথা হয় ওই চরের বাসিন্দা সখিনা বেগম এর সাথে। কেমন আছেন জানতে চাইলে ছাহেরা বেগম অসহায়ত্ব নিয়ে তাকিয়ে রইলেন। হঠাৎ আকুতি মিনুতি করে বললেন, এক বছর আগে নদীতে নাও বাইতে গিয়ে স্বামী মারা গেছে। স্বামী মারা যাওয়ার পর এনজিও আলারা ১০ শতাংশ জায়গার উপর ছোট টিনের ঘর করে দিছে। ৩ মেয়ে, ১ ছেলে নিয়ে অভাব অনটনে কাটছে আমাগো সংসার। বড় মেয়ের জামাই ডায়রিয়ায় মারা যাওয়ার পর সে এখন আমার সংসারে আছে। তার ভরণপোষন আমার করতে হয়। মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে আমার ঘাড়ে চেপে দিয়েছে। তারা আমার মেয়ের খোজ খবর নেয় না। দুই বছর আগে পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। চিকিৎসার অভাবে জন্মের কয়েকদিনের মাথায় সেই সন্তানটি মারা যায়।
চর কুকরি মুকরি বার হাজার একশত চৌদ্দজন জনসংখ্যার বসতি। এখানকার বেশিরভাগ মানুষই সুবিধা বঞ্চিত। সাগর মোহনায় অবস্থিত চর থেকে চর কচ্ছপিয়া হয়ে চরফ্যাশন উপজেলা পর্যন্ত উত্তাল সাগর খেয়া পার হতে সময় লাগে দুই ঘন্টা। বর্ষাকালে ঝড় বাতাসে তাও বন্ধ থাকে। চিকিৎসা সেবার কোন ব্যবস্থা নেই এই চরে। বিনা চিকিৎসায় অনেক মানুষ মারা যায়। শিক্ষা ব্যবস্থা পঞ্চম শ্রেণীর উপরে নাই এখানে। শিশুরা পঞ্চম শ্রেণীর উপরে কোন শিক্ষা লাভ করতে পারে না। রাস্তাঘাটের তেমন কোন নির্দশন নেই এই চরে।
এই এলাকায় এমন অনেকে ছেলে মেয়ে আছে যাদের মেধা আছে। বাবা-মাও চায় তাদের মানুষ করতে। কিন্তু প্রকৃতির বিরূপ আচরণের কারনে তারা তা পেরে উঠছে না। হয়তো তিন চার বছর পরিশ্রম করে কিছু অর্থ জমিয়ে নিজের ঘরটি ঠিক করেছে। ছেলে মেয়েদের খাবার যোগাড় করছে। হঠাৎ কাল বৈশাখীর ছোবল কিংবা জলোচ্ছ্বাসে তাদের এই সামান্য সম্বলটি ভেঙে চুরমার করে দেয়। ওই পরিবারগুলো আবার সেই দারিদ্রের বিত্তে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। প্রকৃতপক্ষে তাদের জন্য কিছু একটা করা অতীব জরুরী।
ভোলা একটি দ্বীপজেলা এখানে অনেকগুলো চর আছে। ভোলা জেলা সদরটিও একটি চর ছিল। আজ থেকে ৮০০ থেকে ৯০০ বছর আগে। এখন একটি জেলায় পরিণত হয়েছে। এই জেলার মধ্যে অনেকগুলো চর রয়েছে। এখানে অবকাঠামোগত উন্নয়ন শিক্ষা, স্বাস্থ্য উন্নয়ন ঘটানো একান্ত জরুরী।
নদীভাঙনের শিকার কয়েক হাজার মানুষের আশ্রয়স্থল এখন মেঘনা নদীর মাঝে জেগে ওঠা একটি চর। বাসিন্দারা এর নাম দিয়েছেন ‘ভোলার চর’। এই বাসিন্দারা চরটিতে স্থানীয় হয়ে উঠেছেন ১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে। চরটিতে আসায় তাঁদের শুধু জায়গারই পরিবর্তন হয়েছে। নিত্যকার জীবনের দুর্ভোগ থেকে গেছে মূল ভূখ-ের মতোই।
চরে মানুষের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। ধারণার ভিত্তিতে স্থানীয় বাসিন্দারা এ তথ্য দিয়েছেন। জনসংখ্যার সঠিক হিসাব নেই প্রশাসনের কাছে। ভোলা সদর উপজেলার অন্তর্ভুক্ত চরটিতে রাজাপুর ইউনিয়ন থেকে ট্রলারে করে যেতে প্রায় এক ঘণ্টা লাগে। সাধারণভাবে শান্তিপূর্ণ একটি জনবসতি মনে হলেও বিপরীতটা জানা গেল মানুষের সঙ্গে কথা বলে। ট্রলারে করে দূবৃত্তদের যাতায়াত আছে এই চরে। তারাই এই চরের শাসন নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন। জমির মালিকানা দাবি করে বাসিন্দাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করেন, না দিলে কেটে নিয়ে যান খেতের ফসল ও গবাদিপশু। মূল ভূখ- থেকে দূরে হওয়ায় চরটির বাসিন্দারা উপজেলা প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও নালিশ দিতে পারেন না।
চরের বাসিন্দা মোজাম্মেল হোসেন বলেন, রাজাপুর ইউনিয়নের ভাঙনকবলিত মানুষ ১৫ থেকে ১৬ বছর আগে চরে এসে হোগলাপাতা, খড়, বাজালি বন পরিষ্কার করে বসবাস শুরু করেন। ভাঙনের কারণে এ চর ভোলা থেকে অনেক দূরে। তবে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ ও লক্ষ্মীপুরের কাছে। স্থানীয় জোতদার ছাড়াও পাশের দুই জেলার লোকজন মাঝেমধ্যে চরে হামলা চালিয়ে সম্পদ লুট করেন।
সরকারকে চরের জমির বাৎসরিক খাজনা দিতে হয় না। কিন্তু ভূমিদস্যুরা চরে বসবাসকারীদের কাছে থেকে বসবাস, ফসল উৎপাদন, গবাদিপশু পালনের জন্য বাৎসরিক চাঁদা নেয়। চাঁদা না দিলে ডাকাত দিয়ে হামলা, ঘরবাড়ি ভাঙচুর, খেতের ফসল, গবাদিপশু লুট করা হয়।
মজিদ মাতাব্বর, স্থানীয় বাসিন্দা আরেক বাসিন্দা শরিফ উদ্দিন বলেন, বছরে দুটি ফসল উৎপাদন হয়। ফসল উৎপাদনের সময়ই মূলত হামলার ঘটনা বেশি ঘটে। চরটি ভোলা, মেহেন্দিগঞ্জ নাকি লক্ষ্মীপুরের; তা নিয়ে মূল ভূখ-ের প্রভাবশালীদের মধ্যে বিরোধ আছে। সে বিরোধের জেরেও চরে এসে হামলার ঘটনা ঘটে।
এসব বিরোধকে কেন্দ্র করে চরবাসী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। দিনে দিনে জমিতে ফসলের আবাদ যত বাড়ছে, তাঁদের সমর্থকদের হামলাও তত বাড়ছে। এ ছাড়া চরের জেলেরাও দূবৃত্তদের কাছে গলদা-বাগদা চিংড়ির রেণু বিক্রি করতে বাধ্য হন। মূল ভূখ-ে একটি রেণুর দাম পাঁচ টাকা হলেও চরে জেলেদের সে রেণু এক টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়।
আব্দুল শহিদ নামের এক বাসিন্দা বলেন, সরকারকে চরের জমির বাৎসরিক খাজনা দিতে হয় না। কিন্তু ভূমিদস্যুরা চরে বসবাসকারীদের কাছে থেকে বসবাস, ফসল উৎপাদন, গবাদিপশু পালনের জন্য বাৎসরিক চাঁদা নেয়। চাঁদা না দিলে ডাকাত দিয়ে হামলা, ঘরবাড়ি ভাঙচুর, খেতের ফসল, গবাদিপশু লুট করা হয়।
চরের জমি সরকারি। কয়েকজন মালিকানা দাবি করে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালাচ্ছেন।
এরকম ভোলা জলার চারদিকে রয়েছে জেগে ওঠা অসংখ্য চর (মাঝের চর, সোনার চর, চর পাতিলা, ঢালচর, তাড়ুয়ার চর, চর কুকরী মুকরী, চর কচ্ছপিয়া, হেকমার চর, টেগরার চর, ভেলুমিয়ার চর, চর নিজাম) অঞ্চল। এ সকল এলাকার অর্থনৈতিক অবস্থা এরকম বিরাজ করলেও তাদের সামজিক অবস্থার নেই কোন উন্নতি। নেই স্যানিটেশন, সুপেয় পানি ব্যবস্থা থেকে শুরু করে স্বাভাবিক জীবন ধারণের সুযোগ-সুবিধা। যোগাযোগের নেই কোন ব্যবস্থা। বন্যা জলোচ্ছাসের সময় মৃত্যুঝুকি নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। বন্যা জলোচ্ছাসের সময় তাদের জীবন রক্ষার্থে কোন ব্যবস্থা নেই।

ফেসবুকে লাইক দিন