বিএনপির সামনে দুই টার্গেট

রাজধানী প্রতিনিধি##

মূল দুটি টার্গেট নিয়ে এগোচ্ছে রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। প্রথমটি হলো- সারা দেশে যে কোনো মূল্যে দল ও অঙ্গ সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী ও সংগঠিত করা। আর দ্বিতীয়টি- ২০২৩ সালের দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন। সে নির্বাচনেই হবে দল ও নেতৃত্বের চূড়ান্ত পরীক্ষা। ক্ষমতাসীনদের সব কৌশল মোকাবিলা করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার মাধ্যমেই সে অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে তাদের। এই লক্ষ্য নিয়েই কাজ শুরু করেছেন দলটির নীতি-নির্ধারকরা। এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমাদের সামনে এখন একটাই চিন্তা- দল পুনর্গঠন এবং দেশব্যাপী তা শক্তিশালী করা। এ লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।।

বিএনপির নীতি-নির্ধারণী মহল সূত্রে জানা গেছে, চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতিতে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি যৌথ নেতৃত্ব তৈরির মাধ্যমে যুক্তরাজ্য থেকে দলটি পরিচালনা করছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে ইতিমধ্যে নিজস্ব একটি পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। সে অনুসারেই স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মতামত নিয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তিনি। নজর রাখা হচ্ছে- সময়ের দিকে। টানা দেড় বছর করোনা মহামারীর কারণে মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হতে না পারার ক্ষতি এবার পুষিয়ে নিতে চায় দলটি। যত দ্রুত সম্ভব সব বিভাগ, জেলা, মহানগর ও উপজেলা কমিটি গঠনের কাজ সম্পন্ন করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্টদের। তারই অংশ হিসেবে মহানগর কমিটিগুলো গঠন করা হচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর বিএনপির কমিটি ইতিমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে। করোনার কারণে দৃশ্যমান না হতে পারলেও সারা দেশে ভার্চুয়ালি সভা, আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রয়েছে নেতা-কর্মীদের মধ্যে।

এ বিষয়ে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, একদিকে সরকারের নিষ্পেষণ, নিষ্ঠুর আচরণ এবং মামলা-হামলা, অন্যদিকে করোনা মহামারী। তার মধ্যেও আমাদের নেতা-কর্মীদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হচ্ছে। বিশেষ করে সারা দেশের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এখন ভার্চুয়ালি সভা/আলোচনার মাধ্যমেই নেতা-কর্মীদের মধ্যে যোগাযোগটা বেশি চলছে। সাংগঠনিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি দেশব্যাপী আমাদের নেতা-কর্মীরা করোনা প্রতিরোধে সাধ্যমতো জনগণের পাশে দাঁড়ানোরও চেষ্টা করছেন। আগামী দিনে যথাযথ প্রক্রিয়ায় নির্দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি আদায়েরও চেষ্টা করা হবে বলে জানান দলের এই নীতি-নির্ধারক। একই বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লাহ বুলু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, করোনার এই মহামারী ‘বিএনপির জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না মাঠে নামার কোনো পরিকল্পনা। সভা-সমাবেশের মধ্য দিয়ে নেতা-কর্মীদের সক্রিয় করা যাচ্ছে না। নির্বাচনসংক্রান্ত দাবিগুলো পূরণে চাপ প্রয়োগ করাও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে করোনা বিএনপির রাজনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মারাত্মকভাবে বাদ সেধেছে। তারপরও আমাদের নেতা-কর্মীরা তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন। সাংগঠনিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি সারা দেশে জনগণের পাশে অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ বিভিন্ন রকমের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসামগ্রী নিয়ে যাচ্ছেন।

বিএনপির আরেক ভাইস চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আগামী ২০২৩ সালের দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে ‘নিরপেক্ষ নির্বাচন’ অনুষ্ঠানে যেসব দাবি রয়েছে, তা আদায়ে সর্বাত্মক কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। বিশেষ করে ভোট চুরির নির্বাচন প্রতিরোধে প্রয়োজনে সংবিধানে সংশোধনী আনাসহ যা যা করা দরকার, তার সবকিছুই করা হবে ইনশা আল্লাহ।

২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির মূল দাবি ছিল নিরপেক্ষ একটি সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান। এ দাবিতে ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনের আগে হরতাল-অবরোধসহ দেশজুড়ে দীর্ঘ আন্দোলন গড়ে তুলে ছিল দলটি। কিন্তু দাবি পূরণ না হওয়ায় নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে দলটি আন্দোলন অব্যাহত রাখে। সরকারের পক্ষ থেকে তখন ওই নির্বাচনকে ‘সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে’ উল্লেখ করা হলেও পরবর্তীতে রাজনৈতিক কলাকৌশলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ওই সরকারই টিকে যায় এবং পরে আরও শক্তিশালী অবস্থানে চলে আসে। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট কিছু সভা-সমাবেশ ছাড়া শক্ত কোনো আন্দোলনের কর্মসূচি দিতে পারেনি। তবুও প্রতিকূল পরিবেশেই নির্বাচনে অংশ নেয় দলটি। পরে সে নির্বাচনে তাদের ভাগ্যে জোটে মাত্র ৭টি আসন।

এ সম্পর্কে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনী ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলেছে। মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে তারা গণতন্ত্রের লেবাসে একদলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সে দাবি আদায়ে সর্বস্তরের জনতাকে সম্পৃক্ত করে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। জানা গেছে, আন্দোলনের মাঠে গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন হিসেবে ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলকেও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। এ ছাড়াও খুব শিগগিরই জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্‌বায়ক আবদুস সালাম এ প্রসঙ্গে বলেন, এখন আমাদের অন্য সব চিন্তা বাদ দিয়ে চোখ বন্ধ করে দল গোছাতে হবে। শক্তিশালী করতে হবে প্রতিটি ইউনিটকে। সব পর্যায়ে সংগঠনকে গুছিয়ে আন্দোলনের জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে হবে।

ফেসবুকে লাইক দিন