আজও স্মৃতি হয়ে ভাসে রসুইঘরে টগ্গি, পাশে তালাশি, ঝুলছে ছিক্কা—

মহিউদ্দিন মহিন: আমার শৈশব আজ আর বর্তমানের কোনো ঠিকানায় বাস করে না। সে বাস করে স্মৃতির এক অবিনশ্বর জনপদে—যেখানে চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে কাঁচা মাটির উপর দাঁড়ানো আমাদের টিনের ঘর, উঠোনের ধুলো, পুকুরঘাটের কোলাহল আর সেই সব গৃহস্থালির নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণ, যেগুলো প্রকৃতির কোলে জন্ম নিয়ে মানুষের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে ছিল যে, সেগুলো ছাড়া সংসার কল্পনাই করা যেত না।
আজকের আধুনিক যন্ত্রনির্ভর জীবনে দাঁড়িয়ে আমি যখন পেছনে তাকাই, তখন আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে আমাদের শৈশবের রসুইঘর—যেখানে মা, খালা, ফুফু, বোনেরা প্রকৃতির উপাদান দিয়ে তৈরি সরল অথচ কার্যকর গৃহস্থালি সামগ্রী দিয়ে নিঃশব্দ দক্ষতায় ঘরের সব কাজ সামলাতেন। সেসব উপকরণ ছিল কাঠ, নারিকেল, তাল, সুপারি, হোগলা পাতা আর বাঁশ-বেতের মেলবন্ধন—কৃত্রিমতার কোনো ছোঁয়া সেখানে ছিল না।
আমাদের রসুইঘরের প্রথম যে জিনিসটি আমার চোখে ভাসে, তা হলো টগ্গি। পরিপক্ব নারিকেলের মালা পরিষ্কার করে তার দুই পাশে ছিদ্র করে সুপারি গাছের ফালি দিয়ে তৈরি শলাকা ঢুকিয়ে বানানো হতো এই টগ্গি। এটি ছিল আধুনিক চামচের পূর্বপুরুষ। রান্না করা তরকারি কিংবা ঝোল জাতীয় খাবার পরিবেশনে টগ্গির ব্যবহার ছিল অপরিহার্য। আজও মনে পড়ে—টগ্গির সঙ্গে ভেসে আসা গরম তরকারির সেই স্বাভাবিক ঘ্রাণ, যা প্লাস্টিক বা ধাতব চামচ কখনো দিতে পারে না।
এরপর আসে তালাশি—শক্তপোক্ত গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি প্রায় দুই হাত লম্বা এক অনন্য উপকরণ। প্রশস্ত মাথা ও সরু হাতলবিশিষ্ট তালাশি দিয়ে ভাত ও তরকারি নাড়াচাড়া করা হতো। রান্নার সময় হাঁড়ির তলানি যেন পুড়ে না যায়, সে দায়িত্ব ছিল তালাশির। মা-খালারা ভাত রান্নার মাঝপথে তালাশির মাথায় কয়েকটি চাল তুলে দেখে নিতেন—চাল ফুটেছে কি না। তালাশি ছিল রান্নার নীরব প্রহরী।
আচা ছিল খাবার পরিবেশনের আরেকটি সুন্দর উপকরণ। পরিপক্ব নারিকেলের মালা অর্ধেক করে কেটে, চামচের মতো আকৃতি দিয়ে বানানো হতো আচা। মা কিংবা খালারা আচা দিয়ে যখন আমাদের থালায় ভাত-তরকারি তুলে দিতেন, তখন সেই খাবারে যে মায়ার ছোঁয়া থাকত, তা আজও আমার নাকে লেগে থাকা এক অমলিন সুবাস।
আমার শৈশবের রসুইঘরের আরেক আকর্ষণীয় উপকরণ ছিল পার্কা, যাকে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় বলা হতো গোডনি। সুপারি গাছের শলাকা আর নারিকেলের বাঁকানো ফালি দিয়ে তৈরি এই যন্ত্রটি দেখতে ছিল চড়কার মতো। রান্নার সময় দানাদার খাবার বা মিশ্রণ নাড়তে পার্কা ব্যবহার করা হতো। গ্রাম্য নারীরা পার্কা ব্যবহারে ছিলেন অপূর্ব দক্ষ—যেন তাদের হাতের বাড়তি শক্তি ছিল এই যন্ত্রটি।
পৌড়চা তৈরি হতো হোগলা পাতা দিয়ে, বিশেষ পদ্ধতিতে রিং আকারে। এর ওপর হাঁড়ি-পাতিল বা খাবারের পাত্র বসানো হতো, যাতে মেঝে বা টেবিল নোংরা না হয়। এটি ছিল পরিচ্ছন্নতার নীরব সহায়ক।
পুড়া ছিল খাদ্যশস্য মাপার একান্ত নিজস্ব উপকরণ। নারিকেল বা তালের কুশ দিয়ে তৈরি ছোট বাটির মতো এই পাত্রে চাল-ডাল মাপা হতো। আমাদের ঘরে একাধিক পুড়া ছিল—কোনোটি এক কেজি, কোনোটি আধা কেজি মাপার উপযোগী। গ্রামের নারীরাই নিজেদের দক্ষতায় পুড়া তৈরি করতেন। বাজারে আবার রঙিন আলপনা আঁকা পুড়াও পাওয়া যেত—যা ছিল ব্যবহারিক সৌন্দর্যের অনন্য নিদর্শন।
ঘর ও উঠান পরিষ্কারের জন্য আধুনিক ঝাড়ুর বদলে আমাদের ছিল কাইছা। নারিকেল গাছের শলা দিয়ে তৈরি এই ঝাড়ু দিয়ে ভারী ও খোলা জায়গা পরিষ্কার করা হতো। সূক্ষ্ম পরিষ্কারের জন্য ছিল পিছা—সুপারি গাছের ডগা দিয়ে বানানো হালকা ঝাড়ু। গ্রামের নারীরা নিপুণ হাতে এসব ঝাড়ু তৈরি করতেন।
খাবার সংরক্ষণের জন্য ছিল ছিক্কা—বেত, বাঁশ বা হোগলা পাতায় তৈরি ঝোলানো শিকা। এতে খাবার ঝুলিয়ে রাখা হতো বিড়াল, ইঁদুর কিংবা কুকুরের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। আমাদের শৈশবের ঘরে হোগলা পাতার ছিক্কা ঝুলতে দেখেছি বহুবার।
বাসন-কোসন পরিষ্কারের জন্য ছিল লুড়ি। পুরোনো টেটটন কাপড় দিয়ে তৈরি এই লুড়ি কাঠখড়ির ছাই দিয়ে ব্যবহার করা হতো। পুকুরঘাটে বসে হাঁড়ি-পাতিল ঘষার দৃশ্য আজও আমার চোখে জল আনে—সেই শব্দ, সেই গন্ধ, সেই সময়। বাড়ণী ছিল চুলার ছাঁই পরিষ্কার করার বিশেষ যন্ত্র দেখতে টগ্গির চাইতে একটু বড় বাড়ণী দিয়ে জ্বলন্ত কয়লাও তোলা হতো। তালপাতার তৈরি হাতপাখার বাতাসে দেহ মনকে প্রশান্তি এনে দিত প্রখর গরমে।
আর সবশেষে আসে হিড়া—আজকের ভাষায় পিঁড়ি। কাঠের তৈরি এই বসার উপকরণ ছিল প্রতিটি ঘরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতি ঘরে দশ-বিশটি হিড়া থাকত। আমরা বসে বসে খেতাম, গল্প করতাম, জীবন উপভোগ করতাম।
আজ আধুনিকতার আগ্রাসনে সিনথেটিক আর ধাতব যন্ত্রপাতি আমাদের ঘর দখল করেছে। হারিয়ে গেছে সেই প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি গৃহস্থালি সামগ্রী। তবুও সেগুলো হারিয়ে যায়নি আমার ভেতর থেকে। আজও চোখ বন্ধ করলেই দেখি—আমাদের মা, খালা, বোনেরা সেই রসুইঘরে দাঁড়িয়ে আছেন, হাতে টগ্গি, পাশে তালাশি, ঝুলছে ছিক্কা—আর আমি দাঁড়িয়ে আছি স্মৃতির দরজায়।
এই স্মৃতিগুলোই আমার শৈশব, আমার আত্মপরিচয়, আমার শিকড়।
