ভোলার বাজারে ভোক্তা-বিক্রেতা দ্বন্দ্ব: প্রতারণা ও অনিয়মের চিরচেনা চিত্র- মোঃ মহিউদ্দিন

মোঃ মহিউদ্দিন: ভোলা জেলার কাঁচাবাজার হোক কিংবা মাছ-মাংসের দোকান—ভোক্তা ও বিক্রেতার মাঝে দ্বন্দ্ব যেন চিরকালীন। প্রতিদিনের কেনাকাটায় ক্রেতারা নানাভাবে প্রতারণার শিকার হন, অথচ বেশিরভাগ সময় তা প্রমাণ বা প্রতিবাদ করার সুযোগ থাকে না। বাজারের প্রতিটি শাখায়, প্রতিটি পণ্যে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন রকম অনিয়ম।
ডিজিটাল ওজন যন্ত্র: আড়ালের খেলা- ভোলার প্রায় দোকানেই দেখা যায় ডিজিটাল ওজন মেশিন রাখা হয় ক্রেতার বিপরীত পাশে। এতে ক্রেতারা ওজন দেখতেই পান না। যেসব ক্রেতা অক্ষর পড়তে অক্ষম, তারা সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় প্রতিবার ঠকছেন। অনেক সময় এসব মেশিনে গোপনে সেটিং করে রাখা হয়, ফলে প্রতিবার কয়েক গ্রাম করে কম দেওয়া হয়—যা দিনের শেষে বিক্রেতার জন্য বড় অঙ্কের বাড়তি আয় নিশ্চিত করে।
মাংস ব্যবসায়ীদের প্রতারণা:
মাংসের বাজারে ভোক্তাদের অভিযোগ আরও গুরুতর। ওজনে কম দেওয়া, মাংসের তুলনায় হাড় বেশি দেওয়া, দীর্ঘক্ষণ বাইরে রেখে পচা মাংস বিক্রি করা—এসব যেন প্রতিদিনের রুটিন। তাছাড়া, অধিকাংশ মাংস ব্যবসায়ী ক্রেতাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। দাম নিয়ে প্রশ্ন করলে প্রায়ই বাকবিতণ্ডা সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের কারণে মাংসের দাম ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যায়।
মাছ ব্যবসায়ীদের অভিনব কৌশল:
মাছ বিক্রেতাদের প্রতারণার ধরন আরও সূক্ষ্ম। ডালার নিচে ছোট মাছ সাজিয়ে রাখা হয়, উপরে বড় মাছ। ফলে ক্রেতা বড় মাছের দাম দিয়ে কিনে আনেন ছোট মাছ। আবার অনেক সময় মাছ দীর্ঘক্ষণ বরফে রাখার কারণে পচে যায়, কিন্তু বিক্রেতারা সেটি গোপন করে উচ্চমূল্যে বিক্রি করেন।
মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য ও মুদির দোকান:
ভোলার মুদির দোকানগুলোতে মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রির প্রবণতা প্রবল। অধিকাংশ ক্রেতা তারিখ পরীক্ষা না করেই পণ্য কিনে থাকেন, যা ব্যবসায়ীদের সুযোগ সৃষ্টি করে। ডিজিটাল ওজন মেশিনের যান্ত্রিক প্রতারণার পাশাপাশি তেল বিক্রেতারা বিশেষভাবে ছোট চোংগ তৈরি করে প্রতারণা করেন।
ফলের বাজার: সিন্ডিকেটের কারসাজি
ফল বিক্রেতারা প্রায় সবাই মিলে একত্রিত হয়ে সিন্ডিকেট গঠন করেন। ফলে বাজারে একযোগে উচ্চমূল্যে ফল বিক্রি হয়। যেখানে এক কেজি ফলের দাম যৌক্তিকভাবে কম হওয়ার কথা, সেখানে অতিরিক্ত দাম গুনতে হয় ক্রেতাদের। একই বাজারে এক দোকানে শসার দাম কেজিপ্রতি ৬০ টাকা হলে অন্য দোকানে দুই কেজি ৬০ টাকা বিক্রি করা হয়। এই বৈষম্য ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করে এবং প্রতিযোগিতার বাজার নষ্ট করে।
আরও অনিয়ম: আমার অভিমত
ভোলা জেলার ব্যবসায়ীদের অনিয়ম এখানেই শেষ নয়।
ভেজাল মসলা ও তেল মিশিয়ে বিক্রি করা সাধারণ ঘটনা।
চিনি, চাল ও ডাল—প্রতিটি পণ্যে ওজনে কম দেওয়া হয়।
ঈদ বা মৌসুমী উৎসবের আগে অযৌক্তিকভাবে দাম দ্বিগুণ-তিনগুণ করে দেওয়া হয়।
অনেক সময় বিক্রেতারা অপ্রচলিত ও নিষিদ্ধ কেমিক্যাল ব্যবহার করে সবজি ও ফলের আকর্ষণীয় রং তৈরি করেন।
উপসংহার: ভোলা জেলার ভোক্তা-বিক্রেতার দ্বন্দ্ব মূলত অনিয়ম, প্রতারণা ও সিন্ডিকেট সংস্কৃতির ফল। ভোক্তাদের অসচেতনতা এবং কর্তৃপক্ষের দুর্বল নজরদারির কারণে এসব অনিয়ম বাড়ছে। যদি প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ, ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ীদের নৈতিকতার উন্নয়ন না ঘটে, তবে ভোলার বাজারে প্রতারণা ও শোষণ বন্ধ হওয়া কঠিন।
