স্বেচ্ছাচারী নেতৃত্বের অভিশাপ: বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের অন্তরায়

মোঃ মহিউদ্দিন, ভোলা: বাংলাদেশের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেশের অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক প্রতিষ্ঠান প্রত্যাশিত উন্নয়নের পথে হাঁটতে ব্যর্থ হয়। কেন? এর পেছনে নানাবিধ কারণ থাকলেও, অন্যতম প্রধান কারণ হলো প্রতিষ্ঠান প্রধানের স্বেচ্ছাচারিতা, সমন্বয়হীনতা এবং দূরদর্শিতার অভাব।
স্বেচ্ছাচারিতা ও সমন্বয়হীনতা; প্রতিষ্ঠান প্রধান যদি মনে করেন প্রতিষ্ঠান শুধুই তাঁর একক সম্পত্তি, তবে সেখানেই শুরু হয় পতনের সুর। অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতামতকে তুচ্ছজ্ঞান করা, তাঁদের প্রয়োজনীয় অংশগ্রহণকে অবমূল্যায়ন করা কিংবা তাদেরকে শুধুমাত্র চাকরিচ্যুত করার ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে চরম হতাশা সৃষ্টি করে। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের মনে করেন না, বরং শুধুমাত্র বেতন নির্ভর শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন।
কাঠামোগত দক্ষতার অভাব; একটি প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদে সফল করতে হলে সুশিক্ষিত ও দক্ষ নেতৃত্বের পাশাপাশি কাঠামোগত পরিকল্পনা প্রয়োজন। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানপ্রধানের মধ্যে সেই দৃষ্টিভঙ্গির অভাব প্রকটভাবে দেখা যায়। দূরদর্শী নেতৃত্বের বদলে তাৎক্ষণিক স্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, যা পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আর্থিক স্বজনপ্রীতি ও অপব্যবহার; প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সুবিধা প্রায়শই প্রধান ব্যক্তির ভোগ-বিলাসে ব্যয় হয়। অফিসিয়াল নীতিমালা উপেক্ষা করে নানা অজুহাতে প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। একদিকে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ন্যায্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এ যেন শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা—কিছু সময়ের জন্য সত্য গোপন করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এর ফল হয় ধ্বংস।
শিক্ষিত কর্মীদের প্রতি অবজ্ঞা; আজকের দিনে অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী শিক্ষিত, অভিজ্ঞ এবং যোগ্য। তারা প্রতিষ্ঠানপ্রধানের প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ্য করেন। কিন্তু চাকরি হারানোর ভয়ে মুখ না খুললেও অন্তরে তাঁরা প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। একসময় এই অবদমন তাঁদের আস্থা ভেঙে দেয়। ফলস্বরূপ, প্রতিষ্ঠানটি আর তাদের কাছে আপন মনে হয় না।
পরিণাম: দেউলিয়াত্ব ও ধ্বংস; যে প্রতিষ্ঠান কর্মীদের আন্তরিকতা হারায়, সে প্রতিষ্ঠান দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। ধীরে ধীরে অভ্যন্তরীণ ভাঙন, আর্থিক দুর্বলতা ও আস্থাহীনতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া হয়ে যায়। একসময় তা নিঃশেষ হয়ে যায়—শুধুমাত্র একক ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারী মানসিকতার কারণে।
করণীয়; সমন্বিত নেতৃত্ব: প্রতিষ্ঠানকে একটি পরিবারের মতো পরিচালনা করতে হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা; আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। অংশগ্রহণমূলক নীতি; কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতামতকে মূল্যায়ন করতে হবে। দূরদর্শী পরিকল্পনা; তাৎক্ষণিক লাভ নয়, দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পরিশেষে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন প্রধানত নির্ভর করে নেতৃত্বের উপর। একজন প্রধান যদি অধীনস্থদের সঙ্গে সমন্বয় করে, আস্থা ও স্বচ্ছতার পরিবেশ গড়ে তুলতে পারেন, তবে প্রতিষ্ঠান উন্নতির শিখরে পৌঁছাবে। অন্যথায়, স্বেচ্ছাচারিতা ও ভোগ-বিলাসিতা প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাবে।
