পদ্মার বুকে স্বপ্নের পদচিহ্ন; ভোলা জেলার বাঁচার লড়াই- মোঃ মহিউদ্দিন

নিউজ ডেস্ক: ভোলা থেকে ঢাকার দূরত্ব শুধু কিলোমিটারের হিসাব নয়—এটা একটি জেলার দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, সংগ্রাম আর স্বপ্নবুননের পথ। সেই পথেই আজ হাঁটছে কিছু তরুণ, কিছু বাবা–মা, কিছু অসুস্থ মানুষ; হাঁটছে একটাই চাওয়ায়—একটি সেতু, একটি জীবনরেখা। অসুস্থ তানজিল ও নোমানকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে যাওয়ার পথে যন্ত্রণার মাঝেও যেন একটাই আকুতি—“সবাই দোয়া করবেন।” পদ্মার ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়া এই খবর ভোলা জুড়ে এক অদ্ভুত বিষাদের স্রোত তৈরি করেছিল। তীব্র স্রোতের মাঝে, পদ্মা সেতুর ওপর থেমে, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে নোমান হাওলাদারকে হাসপাতালে নেওয়ার সেই মুহূর্ত—এ যেন ভোলার প্রতিদিনের যাত্রার প্রতিচ্ছবি। আলহামদুলিল্লাহ, নোমান এখন শঙ্কামুক্ত। কিন্তু প্রশ্নটা থেকে যায়—জীবন নিয়ে নদী পার হওয়ার এ বেদনা আর কতদিন?
১. পদ্মা পারাপারের প্রতিটি ঢেউয়ে বয়ে যায় সংগ্রামের গল্প পদ্মা—বাংলার নদীসমূহের রানী। কিন্তু ভোলার মানুষের কাছে এই নদী কখনো কখনো যেন দুর্দান্ত প্রতিপক্ষ। খরস্রোতা পদ্মা পার হতে হলে দরকার সাহস, ভাগ্য—আর এবার দরকার হয়েছিল লাইফ জ্যাকেটও। হঠাৎ করেই দেখা গেল—এক তরুণ এগিয়ে এলেন। মাঈন উদ্দিন—ভোলার চরনোয়াবাদ, পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের সন্তান। বাবা মোহাম্মদ সেলিম, মা মমতাজ বেগমের ৪ ছেলে ২ মেয়ের বড় পরিবার। হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায়ও যখন লং মার্চের খবর পেলেন, বললেন— “ভোলা–বরিশাল সেতুর জন্য লড়ব। যে কষ্ট আমি দেখি, সেটা আর কাউকে দেখতে দেব না।” মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তিনি সংগ্রহ করলেন ১০টি লাইফ জ্যাকেট। খরস্রোতা নদী পেরোতে সেই লাইফ জ্যাকেট ছিল যেন সবার বুক ভরা সাহসের প্রতীক, এক অদৃশ্য আশ্বাস—ভোলার মানুষ কেউই একা নয়।
২. লং মার্চ: হাঁটতে হাঁটতেই জন্ম নেয় এক নতুন ইতিহাস ভোলার তরুণেরা শুধু হাঁটছে না—তাঁরা ইতিহাস লিখছে। রোদে পুড়ে, ধুলায় মাখা, ক্লান্ত শরীর নিয়েও তাদের চোখে স্বপ্নের দীপ্তি— “একদিন সেতু হবেই।” মাঈন উদ্দিনের মতো ছেলেরা যখন সামনে হাঁটে, তখন ক্লান্তি যেন লজ্জা পায়। তাদের পদক্ষেপে যেন জেগে ওঠে পুরো ভোলা—যেন এক সম্মিলিত হাঁটা, এক নীরব ঘোষণা: “আমরা আমাদের অধিকার চাই, আমাদের জীবনরেখা চাই।”
৩. একটি সেতুর অভাবে হাজারো কষ্ট, অগণিত জীবন বিপন্ন তানজিল ও নোমানের ঘটনাই যেন ভোলার প্রতিদিন— অসুস্থতা মানেই নদী পার হওয়ার যুদ্ধ, সময়ের সঙ্গে দৌড়, ভাগ্যের ওপর ভরসা। যদি সেতু থাকত— হয়তো বাবার কাঁধে অসুস্থ সন্তান নিয়ে দৌড়াতে হতো না। হয়তো শঙ্কা নামক শব্দটি এতবার উচ্চারিত হতো না। হয়তো মানুষ নিরাপদে, দ্রুত চিকিৎসা পেতো—হয়তো বাঁচানো যেতো অনেক প্রাণ।
৪. মাঈনরা আছে বলেই ভোলার স্বপ্ন বেঁচে আছে যেসব তরুণ রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাঁটছে, তাদের চোখে পানি নেই—তাদের চোখে রয়েছে আগুন। যে আগুন নিভতে জানে না। যে আগুন বলে— “ভোলা পিছিয়ে থাকবে না। আমাদেরও থাকবে সেতু, থাকবে স্বপ্নপথ।” মাঈন উদ্দিনদের নিষ্ঠা, দুঃখ, আর ভালোবাসা ভোলার অসংখ্য হৃদয়ে এক নতুন বিশ্বাস তৈরি করেছে— ভোলার মাটিতে এমন সন্তানরা জন্মেছে বলেই সেতু একদিন হবেই। একদিন পদ্মার বুকে দাঁড়িয়ে থাকবে ইস্পাতের মহীরুহ— যে সেতু শুধু জেলাকে রাজধানীর সঙ্গে যুক্ত করবে না, মানুষের বেদনার ইতিহাসও শেষ করবে।
৫. ভোলার হাঁটা—ঢাকা পর্যন্ত, জীবন পর্যন্ত আজ ভোলা হাঁটছে।
ফেসবুকে, রাস্তায়, মানুষের মুখে মুখে একটাই উচ্চারণ— “এটা আমাদের বাঁচার লড়াই।” ঢাকা পৌঁছানো শুধু পথের শেষ নয়— এটা দাবির শুরু, অধিকার আদায়ের শুরু, উন্নয়নের ইতিহাস লেখার শুরু। ভোলার মানুষ আর বঞ্চনার গল্প বলতে চায় না। তারা চায় উন্নয়নের গল্প বলতে, চায় চিকিৎসার নিশ্চয়তা, চায় নিরাপত্তা, চায় সময়ের মূল্যায়ন। যে দিন সেই সেতু দাঁড়াবে, সেদিন হয়তো ভোলার শিশুরা গল্প শুনবে— একদল মানুষ ছিল যারা হাঁটতে হাঁটতে স্বপ্ন বানাত, যারা কষ্টকে পায়ের নিচে ফেলে ইতিহাস লিখেছিল। আর সেই ইতিহাসের পাতায় মীর মোশারফ অমিসহ অসংখ্য মাঈন উদ্দিনদের নাম থাকবে ভোলার ভবিষ্যতের আলো হয়ে। #লেখক: কবি, সাহিত্যিক, সিনিয়র লেকচারার
