আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে চান? - বিস্তারিত
ঢাকা আজঃ বৃহস্পতিবার, ১০ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ইং, ১১ই শাবান, ১৪৪৫ হিজরী
সর্বশেষঃ

আজকের দিনে: জাতিসংঘে বাংলাদেশ

ভোলার খবর ডেস্ক: ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের ২৯ তম অধিবেশনে ১৩৬তম সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভ করা সহজ ছিল না। বঙ্গবন্ধুর বিচক্ষণতা এবং দূরদৃষ্টি সম্পন্ন কূটনৈতিক প্রজ্ঞার কারনে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করতে সক্ষম হয়।
১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে বিশ্ব মানচিত্রে নতুন এক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটে, যার নাম বাংলাদেশ। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করা এবং অন্যান্য দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করা বঙ্গবন্ধু ও তার সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। কারন আন্তর্জাতিক সমাজে যখন কোন একটি নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে তখন এর স্বীকৃতির প্রশ্নটি সামনে চলে আসে। কেন না আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ছাড়া কোন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না। স্বীকৃতি আদায়ের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু অসাধারণ কূটনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেন। তিনি জানতেন, বাংলাদেশের মাটিতে যতদিন ভারতীয় সৈন্যের উপস্থিতি থাকবে ততদিন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ বিলম্বিত হবে। কারন পাকিস্তান ও এর সমর্থক রাষ্ট্রগুলো ভারতীয় সৈন্যের উপস্থিতির অজুহাতে নিজেরা তো স্বীকৃতি দিবেই না উপরন্তু অন্যান্য রাষ্ট্রকে বিশেষ করে মুসলিম ও পুঁজিবাদী দেশগুলোকে নিরুৎসাহিত করবে। এ জন্য বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের জেল থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে পা রাখার আগেই সুকৌশলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্ধিরা গান্ধীর কাছ থেকে ১৯৭২ সালের মার্চের মধ্যেই বাংলাদেশের মাটি থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেন। তার এ কূটনৈতিক প্রজ্ঞার কারনে ১৯৭২ সালের মধ্যেই বাংলাদেশে ৩২টি দেশের স্বীকৃতি লাভে সক্ষম হয়। আরও অধিক সংখ্যক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি লাভের জন্য বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কিন্তু চীনের ভেটোর কারনে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভে বিলম্ব ঘটে।
কোন স্বাধীন রাষ্ট্রকে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করতে হলে নিরাপত্তা পরিষদের ৫ টি স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের সমর্থন লাভ করতে হয়।
বঙ্গবন্ধু নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন আদায়ের জন্য বেশ কিছু কৌশল অবলম্বন করেন। যা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জল করে। যেমন:
(ক) সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হিসাবে, “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়” নীতি সংযোজন
(খ) সংবিধানে রাষ্ট্রের আদর্শ হিসাবে গনতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রকে পাশাপাশি স্থান দেয়া
(গ) সংসদীয় গনতন্ত্রের প্রচলন
(ঘ) জোট নিরপেক্ষ আনন্দোলনে যোগ দেয়া।
বঙ্গবন্ধুর জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে ১৯৭২ সালের আগস্ট মাসের আগেই নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ টি অস্থায়ী সদস্যের মধ্যে ১১টি রাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় এবং নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ৫ টি সদস্যের মধ্যে একমাত্র চীন ব্যতীত অপর ৪ টি সদস্য রাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে।
১৯৭২ সালের আগষ্ট মাসের ৮ তারিখ বাংলাদেশ জাতিসংঘে সদস্যপদ লাভের জন্য আবেদন করে। তিনটি প্রক্রিয়ায় এ আবেদন প্রেরণ করা হয়। প্রথমত, জাতিসংঘের মহাসচিব কূট ওয়ান্ডহেইমের কাছে সরাসরি তার বার্তা প্রেরণের মাধ্যমে। দ্বিতীয়ত, ঢাকাস্থ জাতিসংঘের প্রতিনিধি ড. উমব্রিখটের মাধ্যমে। তৃতীয়ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এস.এ. করিমের মাধ্যমে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের সব শর্ত পূরন করায় স্বাভাবিক ভাবেই সদস্যপদ পেতে পারত। কিন্তু পাকিস্তানের প্রচারনায় নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য চীন বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভে বিরোধিতা করে। যার ফলে এই যাত্রায় বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করতে পারল না। তবে জাতিসংঘের স্থায়ী পর্যবেক্ষকের মর্যাদা লাভে সক্ষম হয়।
বঙ্গবন্ধু জানতেন, পাকিস্তানের প্রচারণায় চীন বারে বারেই বাংলাদেশের জাতিসংঘে সদস্যপদ লাভের বিরোধিতা করবে। কিন্তু তিনি হতাশ হননি। বঙ্গবন্ধু নীরব কূটনীতির আশ্রয় গ্রহণ করলেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি রাষ্ট্রদূত কে. এম. কায়সারকে চীনে প্রেরন করেন। কে. এম. কায়সার ইতোপূর্বে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হিসাবে চীনে কাজ করেছিলেন। জনাব কায়সার পূর্ববর্তী কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে চীনের সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হন। এর ফলে বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯ তম অধিবেশনে সদস্যপদ লাভ করে। কিন্তু দুঃখ জনক ব্যপার হল, চীন শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে জাতিসংঘের সদস্য হিসাবে সমর্থন দিলেও নিজে বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসাবে। স্বীকৃতি দেয়নি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে নিহত হন। আর ৩১ আগস্ট চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়!!
লেখক: বিপ্লব চন্দ্র মন্ডল, প্রভাষক, ইতিহাস।

ফেসবুকে লাইক দিন