আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে চান? - বিস্তারিত
ঢাকা আজঃ শুক্রবার, ৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৪ই জুন, ২০২৪ ইং, ৭ই জিলহজ্জ, ১৪৪৫ হিজরী
সর্বশেষঃ

১৩ বছর পর লিমন হত্যাচেষ্টা মামলা সিআইডিতে

মোঃ মাছুম বিল্লাহ কাঠালিয়া প্রতিনিধিঃ ১৩-বছর পর লিমন হত্যাচেষ্টা মামলা সিআইডিতে। আইনজীবী অ্যাডভোকেট আক্কাস সিকদার জানান, আসলে পিবিআই তদন্ত করে আসল ঘটনা জানতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের তদবিরে চূড়ান্ত রিপোর্টে সামান্য কারসাজি করতে বাধ্য হয়েছে। ২০১১ সালে ঝালকাঠিতে ছয় র‌্যাব সদস্যর বিরুদ্ধে কলেজছাত্র লিমন হত্যাচেষ্টা মামলায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে লিমনের মা হেনোয়রা বেগমের নারাজি গ্রহণ করে মামলাটি পুনরায় তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। বুধবার বেলা ১২টার দিকে ঝালকাঠির জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতের বিচারক এএইচএম ইমরানুর রহমান নারাজি আবেদন শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। আদালত পুলিশের পরিদর্শক মো. কামরুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। লিমনের মায়ের পক্ষে আদালতে শুনানি করেন আইন ও সালিশ কেন্দ্র নিয়োজিত আইনজীবী অ্যাডভোকেট আক্কাস সিকদার। মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালের ২৩ মার্চ ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামে বরিশাল র‌্যাব-৮-এর সদস্যরা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সময় তৎকালীন কলেজছাত্র লিমন হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়। পরবর্তীতে লিমনের বাঁ পায়ের হাঁটু থেকে কেটে ফেলতে হয় চিকিৎসকদের। এ ঘটনায় লিমনের মা বাদী হয়ে ২০১১ সালের ১০ এপ্রিল বরিশাল র‌্যাব-৮-এর তৎকালীন ডিএডি লুৎফর রহমান, করপোরাল মাজহারুল ইসলাম, কং মো. আব্দুল আজিজ, নায়েক মুক্তাদির হোসেন, সৈনিক প্রহল্লাদ চন্দ ও সৈনিক কার্তিক কুমার বিশ্বাসসহ আরও অজ্ঞাতনামা ছয় র‌্যাব সদস্যর নামে ঝালকাঠির আদালতে একটি হত্যাচেষ্টা মামলা করেন।
মামলাটি রাজাপুর থানার এসআই আব্দুল হালিম তালুকদার তদন্ত করে ২০১২ সালের ১৪ আগস্ট আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে র‌্যাব সদস্যদের অব্যহতির সুপারিশ করেন। কিন্তু ২০১২ সালের ৩০ আগস্ট লিমনের মা হোনোয়রা বেগম ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে ঝালকাঠির জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে নারাজি দাখিল করেন। আদালত ২০১৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তার নারাজি আবেদন খারিজ করে দেন। খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের ১৮ মার্চ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন করেন হেনোয়রা বেগম। পরে ২০১৮ সালের ১ এপ্রিল অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এসকেএম তোফায়েল হাসান রিভিশন মঞ্জুর করেন। রিভিশন মঞ্জুর হওয়ার পর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেলিম রেজা মামলাটি তদন্তের জন্য ২০১৮ সালের ২২ এপ্রিল পিবিআইকে নির্দেশ দেন। দীর্ঘদিন তদন্ত শেষে পিবিআই প্রধান কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম ২০২২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আদালতে আবারও থানা পুলিশের মতো চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে পিবিআই উল্লেখ করে, লিমন গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা সত্য। তবে কারা তাকে গুলি করেছে, তার কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে সাক্ষ্য-প্রমান পাওয়া গেলে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করা হবে- মর্মে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। ওই চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে লিমনের মা হেনোয়ারা বেগম ২০২২ সালের ৫ ডিসেম্বর আদালতে ফের নারাজি দাখিল করেন। লিমনের মায়ের দাবি, তার ছেলে সন্ত্রাসী ছিল না। একটি ভালো ছেলেকে র‌্যাব গুলি করে পঙ্গু করে দিয়েছে। এ ঘটনার তিনি সুষ্ঠু ও সঠিক বিচার দাবি করেন।
উল্লেখ্য, পা হারানো লিমন হোসেন ২০১৩ সালে এইচএসসি, ২০১৮ সালে আইন বিষয়ে অনার্স ও ২০১৯ সালে এলএলএম পাস করেন। ২০২০ সালে তিনি সাভারে অবিস্থিত গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনবিভাগে সহকারী প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ২০২২ সালে যশোরের অভয়নগর থানার এক কলেজছাত্রীকে বিয়ে করেন তিনি। সাংবাদিকদের লিমন বলেন, ‘র‌্যাব অন্যায়ভাবে আমাকে গুলি করে পঙ্গু করেছে। আমি অনেক কষ্ট করে, মানুষের ভালোবাসায় পড়ালেখা শেষ করেছি ঠিকই, কিন্তু আমার পা হারানোর কষ্ট ভুলতে পারি না। ‘যতদিন বেচেঁ আছি, ততদিন যারা আমাকে পঙ্গু করেছে, তাদের বিচার দাবি করব।’ ২০১১ সালে ঘটনার পর লিমনকে সন্ত্রাসী দাবি করে লিমনসহ আটজনের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে এবং সরকারি কাজে বাধাদানের অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা করে র‌্যাব। ২০১৮ সালে দুই মামলাতেই লিমনসহ সকল আসামি আদালত থেকে নির্দোষ প্রমানিত হয়। ঘটনার শুরু থেকে লিমনকে আইনি সহায়তা দিয়ে আসছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং ঝালকাঠির কয়েকজন আইনজীবী। আসক নিয়োজিত লিমনের মায়ের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আক্কাস সিকদার বলেন, ‘ঘটনার পর রাজাপুর থানা পুলিশ মামলাটির তদন্ত করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (তথ্যগত ভুল) দাখিল করে। প্রতিবেদনে ‌র‍্যাব সদস্যদের অব্যহতির সুপারিশ করা হয়। সেইসঙ্গে লিমনসহ পুরো তার পরিবারকে সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। অপরদিকে পিবিআই প্রায় চার বছর তদন্ত করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (সত্য) দাখিল করে। পিবিআইর তদন্ত কর্মকর্তা রিপোর্টে লিমনকে একজন শান্তশিষ্ট ছাত্র হিসেবে উল্লেখ করে বলেন- র‌্যাব এবং সন্ত্রসীদের গোলাগুলির মধ্যে লিমন গুলিবিদ্ধ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কে তাকে গুলি করেছে তা চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। তিনি জানান, আসলে পিবিআই তদন্ত করে আসল ঘটনা জানতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের তদবিরে চূড়ান্ত রিপোর্টে সামান্য কারসাজি করতে বাধ্য হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘তবে আমার কাছে রিপোর্টটি সত্যের কাছাকাছি মনে হয়েছে। কোনো সংস্থার কাছ থেকে আমরা ন্যায়বিচার না পেলেও মহামান্য হাইকোর্ট থেকে একদিন ন্যায়বিচার ঠিকই পাব।’

ফেসবুকে লাইক দিন