আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে চান? - বিস্তারিত
ঢাকা আজঃ শুক্রবার, ৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৪ই জুন, ২০২৪ ইং, ৭ই জিলহজ্জ, ১৪৪৫ হিজরী
সর্বশেষঃ

আজ মরমী কবি লালন শাহের জন্মদিন

বিপ্লব মন্ডল (বিশেষ প্রতিনিধিঃ): ১৭৭৪ সালের ১৭ অক্টোবর জন্ম গ্রহণ করেন বহুমূখী প্রতিভার অধিকারী ফকির লালন শাহ। যিনি লালন সাঁই,লালন শাহ,মহাত্মা লালন ইত্যাদি নামেও পরিচিত। তিনি একাধারে একজন আধ্যাত্মিক সাধক, মানবতাবাদী, সমাজ সংস্কারক এবং দার্শনিক। লালন শাহ অসংখ্য গানের গীতিকার, সুরকার ও গায়ক ছিলেন।
লালন শাহের জন্ম কোথায় তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। লালন নিজে কখনো তা প্রকাশ করেননি। তার মৃত্যুর ১৫ দিন পর “হিতকরী” পত্রিকার সম্পাদকীয় নিবন্ধনে বলা হয়, “ইহার জীবন লিখিবার কোন উপকরন পাওয়া কঠিন। নিজে কিছু বলিতেন না। শিষ্যরা তাহার নিষেধক্রমে বা অজ্ঞতা বশত: কিছুই বলিতে পারে না।” কিছু সূত্রে পাওয়া যায়, লালন ১৭৭৪ সালে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার বর্তমান বাংলাদেশের ঝিনাইদহ জেলার হারিশপুর গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। কোন কোন লালন গবেষক মনে করেন, লালন শাহ কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী থানার চাপড়া ইউনিয়নের ভাড়ারা গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। কুষ্টিয়া ছিল তৎকালীন নদীয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত।
লালন শাহের বাবার নাম মাধব চন্দ্র কর আর মায়ের নাম শ্রীমতি পদ্মাবতী। লালন শাহের বাল্য নাম ছিল লালন চন্দ্র কর। অর্থাৎ হিন্দু পরিবারে লালন শাহ জন্মে ছিলেন।
শৈশবেই লালন তার বাবাকে হারান। একমাত্র মায়ের আদর স্নেহে বেড়ে উঠেন তিনি। মা ছাড়া তখন তার পৃথিবীতে কেউ ছিল না। মায়ের সেবার কথা ভেবে লালন বিয়ে করেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন নীতিবান। শৈশব থেকেই গান বাজনার সাথে জড়িত ছিলেন। ভাড়ারা গ্রামে কবি গান, পালাগানসহ নানা রকম গানের আসর বসত। লালন সেই আসরে গান করতেন। তার গান শুনে মানুষ মুগ্ধ হত।
কথিত আছে, তীর্থ ভ্রমণে গিয়ে লালন শাহ বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। তাকে মৃত ভেবে তার সঙ্গীরা কলা গাছের ভেলায় করে নদীতে ভাসিয়ে দেন। ভাসতে ভাসতে নদীর তীরে পৌঁছে তার দেহ। তিনি জীবিত আছেন দেখে একজন মুসলিম নারী তাকে বাড়িতে নিয়ে যান এবং সেবা যত্ন দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। লালন সুস্থ হয়ে নিজ গ্রামে পরিবারের নিকট চলে আসেন। কিন্তু তৎকালীন রক্ষনশীল হিন্দু সমাজ তাকে গ্রহন করেনি। কারন তিনি মুসলমানের ঘরের খাবার খেয়েছেন। লালনকে সমাজচ্যুত করা হয়। মূলত এই ঘটনাই লালনের আধ্যাত্মিক চিন্তার দ্বার উন্মোচিত করে।
লালন শাহ নিজ সমাজ থেকে বিতাড়িত হয়ে সিরাজ সাঁইর শিষ্যত্ব গ্রহন করেন।
লালন শাহের ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত ” প্রবাসী” পত্রিকায় লালনের জীবনী রচয়িতা বসন্ত কুমার পাল বলেছেন, “সাঁইজি হিন্দু কি মুসলিম, এ কথা আমিও স্থির বলিতে অক্ষম।
লালনের ধর্ম বিশ্বাস সম্পর্কে ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলছেন, ” লালন ধার্মিক ছিলেন, কিন্তু কোন বিশেষ ধর্মের রীতিনীতি পালনে আগ্রহী ছিলেন না। সব ধর্মের বন্ধন ছিন্ন করে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন।”
লালন সম্পর্কে বলতে গিয়ে সুধীর চক্রবর্তী লিখেছেন, ” কাঙ্গাল হরিনাথ তাকে জানতেন, মীর মোশারফ হোসেন চিনতেন,ঠাকুরদের হাউসবোটে যাতায়াত ছিল, লেখক অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় তাকে সামনাসামনি দেখেছেন কতবার,গান শুনেছেন,তবু জানতে পারেননি লালনের জাত পরিচয়, বংশধারা বা ধর্ম।”
একটি গানে লালন বলেছেন,
” এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে,
যে দিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান
জাতি গোত্র নাহি রবে।
লালন শাহ আবার বলেছেন,
” জাত গেলো জাত গোলো বলে একি আজব কারখানা……………….
গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়, তাতে ধর্মের কি ক্ষতি হয়, লালন বলে জাত কারে কয়……
লালনের গানে মানুষ ও তার সমাজই ছিল মুখ্য। জাত-পাতের ভেদাভেদ ভুলে লালন শাহ বলেছেন, ” কেউ মালা কেউ তসবি গলে,
একেই জাত ভিন্ন বলে।”
দেহতত্ত্ব নিয়ে লালন শাহ বলেছেন,
” আট কুঠুরি নয় দরজা আটা
মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা
তার উপরে সদর কোঠা……..”
” খাচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়……”
লালন শাহের দর্শনে আমরা কামতত্ত্ব দেখতে পাই। যেমন তিনি বলেছেন,” করি কেমনে সহজ শুদ্ধ প্রেম সাধন, প্রেম সাধিতে ফাপরে উঠে কাম নদীর তুফান………. ”
জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার মিলিত হওয়ার আকুতি লালন শাহের দর্শনে পাওয়া যায়,
” মিলন হবে কত দিনে,
আামার মনের মানুষের সনে…….”
আবার জীবাত্মার মুক্তির বিষয় তার আকুতি ছিল— ” যদি ত্বরিতে বাসনা থাকে, ধররে মন সাধুর সঙ্গ………”
” আমি অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময়….”
লালন শাহ ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ১১৬ বছর বয়সে কুষ্টিয়ার কুমারখালির ছেউরিয়াতে নিজ আখড়ায় মৃত্যু বরন করেন। মৃত্যুর দিন ভোর পাঁচটা পর্যন্ত গান বাজনা করেন। এক সময় শিষ্যদের বলেন, ” আমি চলিলাম” এবং এর কিছুক্ষণ পরই তার মৃত্যু হয়। তার নির্দেশ বা ইচ্ছা না থাকায় মৃত্যুর পর হিন্দু বা মুসলিম কোন ধর্মের রীতিনীতি পালন করা হয়নি। তারই উপদেশ অনুসারে ছেউরিয়ায় তার আখড়ার মধ্যে একটি ঘরের ভিতর লালন শাহের সমাধি গড়ে তোলা হয়।
মরমী সাধক লালন শাহের জন্ম ও মৃত্যু দিবসে শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

ফেসবুকে লাইক দিন