আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে চান? - বিস্তারিত
ঢাকা আজঃ মঙ্গলবার, ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ২১শে মে, ২০২৪ ইং, ১২ই জিলক্বদ, ১৪৪৫ হিজরী
সর্বশেষঃ

এন্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স ও আমাদের করণীয়

ভোলার খবর ডেস্ক: ১৯২৮ সালে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং এর হাত ধরে আবিষ্কৃত হওয়া প্রথম এন্টিবায়োটিক পেনিসিলিনের প্রচলনের পর আমরা বাঁচাতে পেরেছি কোটি কোটি মানুষের প্রাণ, অনেক ক্ষেত্রেই গড় আয়ূ বাড়াতে সক্ষম হয়েছি প্রায় ২০ বছর পর্যন্ত। কিন্তু এই এন্টিবায়োটিক যাদের উপরে প্রয়োগ করা হয় সেই ব্যাকটেরিয়াও তো বসে নেই। তারাও নিজেদের কে বাঁচাতে দ্রুত উপায়ে এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে টিকে থাকার জন্য বিবর্তনের মাধ্যমে নিজেদেরকে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী রূপান্তরে ব্যস্ত। তাই একদম সহজ ভাবে বলতে গেলে, কোন ব্যাক্টেরিয়া যখন কোন ধরণের এন্টিবায়োটিকের প্রতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলে ওই এন্টিবায়োটিকের বিপরীতে অদমনীয় হয়ে ওঠে তখন ওই ব্যাক্টেরিয়ার ওপর ওই এন্টিবায়োটিক আর কোন কাজ করে না। ব্যাক্টেরিয়ার এই প্রতিরোধী ধর্মকে ওই এন্টিবায়োটিকের প্রতি ব্যাক্টেরিয়ায়র রেসিস্ট্যান্সি বলা হয়ে থাকে। বিবিসির একটি প্রতিবেদনে দেখা যায় ২০৫০ সাল নাগাদ প্রতি ৩ সেকেন্ডে ১ জন করে মানুষের মৃত্যুর কারণ হবে এই এন্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স। আর প্রতি বছরে এন্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১৫ গুণ বেড়ে হবে ১ কোটির কাছাকাছি। অর্থাৎ ২০৫০ সাল নাগাদ এই এন্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স মৃত্যুর দিক থেকে ক্যান্সারকেও পেছনে ফেলবে। ব্যাক্টেরিয়ার এই রেসিস্ট্যান্সির এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণ কী?
প্রথমত: প্রতিকূল পরিবেশে ব্যাক্টেরিয়ার বিবর্তিত হয়ে টিকে থাকার আশ্চর্য ক্ষমতা। মূলত মানুষের তুলনায় ব্যাক্টেরিয়ার জীবনকাল খুবই অল্প (উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় একটি ই কোলাই ব্যাকটেরিয়ার গড় জীবনকাল সাকুল্যে ১৫-২০ মিনিট) তাই এরা খুব সহজেই বিবর্তিত হয়ে নিজেকে বদলে পরিবেশের সাথে নিজেকে অভিযোজিত করে ফেলতে পারে। জীবজগতে প্রায় সাড়ে তিনশ কোটি বছর আগে ব্যাক্টেরিয়ার আগমন। এই বিরাট সময় বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে ব্যাক্টেরিয়া নিজেদের কে অভিযোজিত করে পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে টিকে আছে। তাই যেকোন বিরূপ পরিস্থিতেও ব্যাক্টেরিয়া নিজেদের মিউটেশনকে ইতিবাচক উপায়ে কাজে লাগানোর আশ্চর্য ক্ষমতা অর্জন করেছে।
দ্বিতীয়ত: এন্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ এবং অপব্যবহার। কেবলমাত্র উন্নয়নশীল দেশ নয় বিভিন্ন উন্নত দেশগুলিতেও নিয়মনীতির ফাঁক ফোকর গলে এন্টিবায়োটিক এর ব্যবহার হচ্ছে যথেচ্ছ মাত্রায়। যেমন অনেক ক্ষেত্রে ভাইরাল ইনফেকশনেও এন্টিবায়োটিক সেবন করছেন অনেকে। এতে উপকারের চাইতে অপকারটা হচ্ছে বেশি। এক আমেরিকাতেই প্রশাসনের প্রচন্ড কড়াকড়ি সত্ত্বেও ৫ কোটির বেশি অনাবশ্যক এন্টিবায়োটিক এর প্রেস্ক্রিপশন দেয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয় , কৃষি ও পশুপালনে এন্টিবায়োটিকের প্রচুর ব্যবহার এন্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্সির হার বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। যেমন , মুরগির ফার্ম গুলিতে ওদের খাদ্যে যে এন্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হয় তা ওই মুরগির ভেতরে এন্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার জন্ম দেয় যা কিনা ওই মুরগির মাংস খাবার পরে সেই ব্যাক্টেরিয়া মানব দেহেও অবস্থান করে। ফলে , মানব দেহও ওই এন্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট হয়ে পড়ে। মানুষের ক্ষেত্রেই যেখানে বছরে প্রায় ৫ কোটি অনাবশ্যক অ্যান্টিবায়োটিকসের প্রেসক্রিপশন দেওয়া হয় সেখানে কৃষি ও পশুপালন ক্ষেত্রে কতটা নিয়ন্ত্রণ হয়েছে সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে!

এখন কথা হচ্ছে আমরা সে যত ভালই এন্টিবায়োটিক ই আবিষ্কার করি না কেনো এক সময় না এক সময় এই সাড়ে তিনশ বছর ধরে টিকে থাকা ব্যাক্টেরিয়া তার বিরুদ্ধে নিজেদের বিবর্তনের অসামান্য ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেই । তাই এখন বিশ্বের অনেক স্থানেই এন্টিবায়োটিকের বিকল্প উপায় উদ্ভাবন করা যায় কিনা সেটা নিয়ে গবেষণা হচ্ছে । কিন্তু সেই গবেষণার সাফল্যের পূর্ব পর্যন্ত আমরা যেটা করতে পারি সেটা হল আমরা একটু সচেতন হয়ে ব্যাক্টেরিয়ার এই বৈবর্তনিক ক্ষমতা অর্জনের পর্যায় কে প্রলম্বিত করতে পারি । কিভাবে? চলুন বলি ।

আমাদের বড্ড বদভ্যাস হচ্ছে সবকিছুতে তাড়াহুড়া করা আর শর্টকাট খোঁজা। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার চেয়ে এজন্যে মোড়ের মুদি দোকানে মুড়ি মুড়কির সাথে এন্টিবায়োটিক কিনে আনতে আমরা বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আর ইচ্ছেমত সেবন করি। অবিশ্যি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাময়িক সময়ের জন্যে আমরা সুস্থ হয়ে যাই ঠিকই। কিন্তু নিজেদের অজান্তেই আমরা এটার মাধ্যমে নিজেদের এবং আমাদের আশেপাশের মানুষের বিপদ ডেকে আনছি। তাই নিজে নিজে ডাক্তারি করাটা বন্ধ করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে এবং যথার্থ নিয়ম মেনে ওষুধ খেতে হবে। ডাক্তারের দেওয়া এন্টিবায়োটিক কোর্স পুরোপুরি শেষ করতে হবে। অর্ধেক কোর্স চলাকালীন সময়ে বন্ধ করে দেবেন না।
আপনার চিকিৎসক বুঝবেন যে আপনার জন্যে কোন ওষুধ দেওয়াটা কার্যকরী হবে। অনেক সময় দেখা যায় শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাবলেই অনেক রোগ সেরে যায় দ্রুত। সুতরাং চিকিৎসকের নির্দেশনা এবং প্রেসক্রিপশন মেনে চলুন। কোনোমতেই ফার্মেসির দোকানদারের কথা শুনে কোন প্রকার এন্টিবায়োটিক সেবন করবেন না। অথবা অন্য কারোর জন্যে প্রেসক্রাইবড এন্টিবায়োটিক নিজে খাবেন না।
খাবার রান্না করার সময় সর্বদা লক্ষ রাখবেন খাবার যেন কখনো আধসিদ্ধ কিংবা অস্বাস্থ্যকর না হয়। রান্নায় সর্বদা নিরাপদ পানি ব্যবহার করবেন এবং অস্বাস্থ্যকর পানি পান থেকে বিরত থাকবেন।
ওষুধ প্রশাসনের শক্ত হাতে এগিয়ে আসতে হবে এন্টিবায়োটিকের এই অপব্যবহার রোধে। বাংলাদেশে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলিতে অনেক সময় হাতুড়ে ডাক্তার মুড়ি মুড়কির মত এন্টিবায়োটিক সরবরাহ করেন। এই ব্যাপারটি বন্ধ করতে হবে। চিকিৎসকের সংকটে যে এন্টিবায়োটিক একদিন জীবন বাঁচানোর তাগিদেই সরকার কে ননমেডিকেল মানুষগুলির হাতে তুলে দিতে হয়েছিল, আবার জীবন বাঁচানোর তাগিদেই তা ফিরিয়ে নিয়ে রেজিস্টার্ড ডাক্তারের হাতে দেয়ার সময় এসে গেছে।
সর্বোপরি এই ব্যাপারটিতে সকলের সচেষ্ট হতে হবে। এন্টিবায়োটিকের এই যথেচ্ছ ব্যবহার রোধ করা আমাদের সকলের মিলিত উদ্যোগ ছাড়া আসলে সম্ভব নয়।

ফেসবুকে লাইক দিন