জুলাইয়ের রক্তে লেখা নতুন বাংলাদেশ ও আগামীর অঙ্গীকার
ইতিহাসের কিছু মুহূর্ত কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বা ক্যালেন্ডারের পাতায় আবদ্ধ থাকে না, তা একটি জাতির আত্মপরিচয়, চেতনা, সমাজকাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তিকে আমূল ও চিরতরে বদলে দেয়। ২০২৪ সালের জুলাই মাস বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসে তেমনই এক অবিস্মরণীয়, রক্তস্নাত অথচ মহিমান্বিত অধ্যায়। যে জুলাইয়ের সূচনা হয়েছিল সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের বৈষম্যবিরোধী একটি অত্যন্ত যৌক্তিক ও সুনির্দিষ্ট দাবির মধ্য দিয়ে, তা অল্প সময়ের ব্যবধানে রূপ নেয় এক অভূতপূর্ব, নজিরবিহীন এবং স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে। রাজপথ প্লাবিত হয়েছিল শত শত তাজা প্রাণ ও নির্দোষ তরুণ-তরুণীর রক্তে। সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট আর তাজা বুলেটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদের দেশের যুবসমাজ প্রমাণ করেছে—অন্যায়, অবিচার ও স্বৈরাচারের সামনে মাথা নত না করার নামই বাংলাদেশ। এই রক্তঝরা জুলাই কেবল কোনো ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এটি একটি জাতির স্বাধিকার, মানবিক মর্যাদা ও নাগরিক অধিকার পুনারুদ্ধারের এক ঐতিহাসিক মহাকাব্য।যে দাবির সূত্র ধরে জুলাইয়ের এই অগ্নিস্ফূলিঙ্গ প্রজ্বলিত হয়েছিল, তা ছিল সরকারি চাকুরিতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক ও মেধাভিত্তিক সংস্কার। একটি বৈষম্যহীন, মেধাভিত্তিক ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের তাগিদে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের তরুণেরা যখন সম্পূর্ণ অহিংস ও রাজতান্ত্রিক শৃঙ্খলায় রাজপথে নেমেছিল, তখন যেকোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের উচিত ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীলতা, বিচক্ষণতা ও অভিভাবকতুল্য মনোভাব নিয়ে তাদের কথা শোনা। কিন্তু রাষ্ট্র ও তৎকালীন ক্ষমতাশীল গোষ্ঠী সেই পথ না বেছে, বেছে নিয়েছিল নজিরবিহীন দমন-পীড়ন, তাচ্ছিল্য ও সহিংসতার নিষ্ঠুর পথ। তরুণদের এই ন্যায়সঙ্গত দাবিকে যেভাবে হেয় করা হলো এবং তাদের ওপর চড়াও হওয়ার রাজনৈতিক ঘোষণা দেওয়া হলো, তাতে ক্ষোভের দাবানল ছড়িয়ে পড়ল দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, পাড়া-মহল্লায় এবং শহরের অলিতে-গলিতে। সাধারণ কোটা সংস্কারের আন্দোলনটি মুহূর্তেই পরিণত হলো শাসনতান্ত্রিক শোষণ ও ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত গণবিস্ফোরণে।জুলাইয়ের দিনগুলো যত গড়িয়েছে, রাষ্ট্রের দমন-পীড়নের ভয়াবহতা ততই বীভৎস রূপ ধারণ করেছে। দেশজুড়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট করে পুরো জাতিকে বৈশ্বিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করা, সান্ধ্য আইন বা কারফিউ জারি, সাঁজোয়া যান ও হেলিকপ্টার থেকে নির্মম গুলি বর্ষণ—কোনো কিছুই জাগ্রত তরুণদের ইস্পাতকঠিন সংকল্পকে টলাতে পারেনি। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের দু-হাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে পুলিশের বুলেটের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সেই মুহূর্তটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর হয়ে গেছে। সেই দৃশ্য কেবল একজন বীরের আত্মদানের বিবরণ নয়, তা ছিল সমগ্র বাংলাদেশের কোটি যুবকের অন্তরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের ভয় ও দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার এক মহাকাব্যিক রূপক। একইভাবে আন্দোলনের মাঠে "পানি লাগবে কারো, পানি?" বলতে বলতে জীবন দেওয়া মায়াবী তরুণ মুগ্ধের সেই শেষ ডাক কিংবা রাজপথে খেটে খাওয়া রিকশাচালক, শ্রমিক, দিনমজুর ও কোমলমতি স্কুল শিক্ষার্থীদের আত্মদান জাতির সুপ্ত বিবেককে এক প্রচণ্ড চাবুক মেরে জাগিয়ে তুলেছিল। রাষ্ট্রযন্ত্র যখন বুলেট আর হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে একটি পুরো প্রজন্মকে স্তব্ধ ও আতঙ্কিত করে দিতে চেয়েছিল, তখন সেই বুলেটের মুখেই জন্ম নিয়েছিল নির্ভীক প্রতিরোধের এক নতুন ইতিহাস। রাজপথে শিক্ষার্থীরা একা ছিল না; তাদের অসীম সাহসিকতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজপথে ঢল নেমেছিল শিক্ষক, অভিভাবক, চিকিৎসক, আইনজীবী, সাংবাদিক, শিল্পী, পেশাজীবী এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের।এই রক্তঝরা জুলাই কেবল একটি রাজনৈতিক ক্ষমতাচ্যুতির আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল গভীর এক মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপ্লব। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে দেশে যে ভয়, নীরবতা, তোষামোদ ও অপসংস্কৃতির দেয়াল তুলে দেওয়া হয়েছিল, জুলাইয়ের তরুণদের রক্তে তা এক লহমায় ধুয়ে-মুছে গেছে। তরুণরা প্রমাণ করেছে, যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়, যখন আইন তার স্বকীয়তা হারায় এবং বিচার ব্যবস্থা প্রহসনে পরিণত হয়, তখন জনগণের ঐক্যবদ্ধ ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধই চূড়ান্ত ফয়সালা তৈরি করতে পারে। এই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর সর্বজনীনতা ও নিবেদিত মানসিকতা। কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানার ছাড়াই একটি পুরো জাতি লাল পতাকার নিচে সমবেত হয়েছিল। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন কোটার গণ্ডি ছাড়িয়ে এক দফার গণদাবিতে উন্নীত হয়েছিল কারণ সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে জমে থাকা দুর্নীতি, অন্যায়, বাকস্বাধীনতা হরণ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে মানুষের দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল এই আন্দোলনের মাধ্যমে।তবে রক্তঝরা জুলাই আমাদের যে নতুন সূর্যাস্ত ও স্বাধীনতার দ্বিতীয় সুযোগ উপহার দিয়েছে, তা অর্জিত হয়েছে অত্যন্ত চড়া মূল্যে। শত শত শহীদের আত্মত্যাগ, হাজার হাজার সাধারণ মানুষের পঙ্গুত্ব বরণ এবং বহু তরুণের চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারানোর বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা আমাদের কাঁধে এক বিশাল ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা চাপিয়ে দিয়েছে। শহীদের এই রক্ত যেন বৃথা না যায় এবং এই ত্যাগের সাথে যেন কোনো প্রকার প্রতারণা না ঘটে, তা নিশ্চিত করার একমাত্র পথ হলো রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল ও টেকসই সংস্কার। যে শাসনতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে রাষ্ট্র নিজের জনগণের দিকেই অস্ত্র উঁচিয়ে ধরতে পারে, সেই ব্যবস্থার চিরস্থায়ী রূপান্তর ঘটানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক দাবি।প্রথমত, জুলাই গণহত্যার সুনির্দিষ্ট ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই হত্যাযজ্ঞের নির্দেশ দিয়েছেন, বাস্তবায়ন করেছেন বা সহায়তায় ছিলেন, তাদের আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে আইনগত প্রক্রিয়ায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান না ঘটলে ভবিষ্যতে নতুন করে কোনো স্বৈরাচারী মানসিকতার পুনরুত্থান ঠেকানো সম্ভব হবে না। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা পুনারুদ্ধার করতে হবে। বিচার বিভাগ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নির্বাচন কমিশন এবং জনপ্রশাসনকে দলীয়করণের কলঙ্ক থেকে মুক্ত করে স্বাধীন, পেশাদার ও জনমুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা অপরিহার্য। তৃতীয়ত, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে যে চর্চা গড়ে উঠেছে, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে সহনশীলতা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সাম্যের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।আজকের এই 'জুলাই প্রজন্ম' বা বিপ্লবের অংশীদার তরুণেরা যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছে, তা কেবল কোনো প্রশাসনিক বা ভৌগোলিক পরিবর্তনের গল্প নয়। তারা এমন এক বাংলাদেশ চায় যেখানে মতপ্রকাশের অপরাধে কাউকে গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হবে না। তারা এমন এক সমাজ চায় যেখানে কালো আইনের ভয়ে গণমাধ্যমের কণ্ঠ রুদ্ধ করা হবে না, যেখানে মেধা ও যোগ্যতাই হবে নাগরিকের প্রধান পরিচয়, আর ধর্ম, বর্ণ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কারো সাথে কোনো ধরনের বৈষম্য করা হবে না। তরুণরা দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা কেবল রাজপথে স্লোগান দিতে ও প্রতিরোধ গড়তে জানে না, বরং তারা রাষ্ট্র সংস্কারের দূরদর্শী চিন্তাতেও সমান পরিণত ও দায়িত্বশীল।অবশ্য যেকোনো গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এক বিশাল চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। অপশক্তি বা স্বার্থান্বেষী মহল সবসময়ই বিপ্লবের অর্জনকে হাতছাড়া করতে, জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে ঘোলা জলে মাছ শিকার করতে তৎপর থাকে। এই সংকটময় সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো সেই ঐক্য যা জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে রাজপথে তৈরি হয়েছিল। সাময়িক উত্তেজনা বা ক্ষুদ্র স্বার্থে যদি আমরা নিজেদের বিভাজিত করি, তবে তা হবে শহীদের রক্তের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। দেশে দ্রুত আইন-শৃঙ্খলার পূর্ণ পুনরুদ্ধার, বিচার ব্যবস্থার আস্থা ফিরিয়ে আনা, অর্থনৈতিক গতিশীলতা জোরদার করা এবং সব স্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাই এখন মূল অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।পরিশেষে বলা যায়, ইতিহাসজুড়ে জুলাই বারবার ফিরে আসবে এক বিজয়ের প্রতীক হয়ে এবং একই সাথে এক বেদনাবিধুর স্মারক হিসেবে। জুলাইয়ের রক্তরাঙা দিনগুলো আমাদের প্রতিদিন মনে করিয়ে দেবে যে, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো ন্যায়বিচার, মানবমর্যাদা, সমতা ও গণতন্ত্র। যে বীর সন্তানরা বুক পেতে দিয়ে আমাদের কথা বলার অধিকার, মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শক্তি এবং নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস ফিরিয়ে দিয়েছেন, জাতির স্মৃতিপটে তারা চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন। আবু সাঈদ, মুগ্ধ, রিয়া কিংবা অগণিত নাম না জানা শহীদের রক্তের ঋণ আমরা শোধ করতে পারব কেবল তখনই, যখন আমরা তাদের স্বপ্নের বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ বাস্তবে রূপ দিতে পারব। জুলাইয়ের সেই অবিনাশী চেতনা আমাদের প্রতিটি নাগরিকের ধমনীতে চিরকাল প্রবহমান থাকুক, আর সেই চেতনার আলোতেই রচিত হোক আমাদের আগামীর মুক্ত, গণতান্ত্রিক ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ।
মো: আশরাফুল আলম ( লেখক ও গবেষক)
সহকারী প্রধান শিক্ষক
টবগী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ভোলা সদর, ভোলা।