"বিস্মৃত স্মৃতির অন্তরালে, সত্য উদ্ঘাটনের আইনি চ্যালেঞ্জ"
যেকোনো ঐতিহাসিক অপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কেবল আইনি প্রক্রিয়ার অংশ নয়, বরং তা একটি জাতির দায়মুক্তির পথ। তবে সেই বিচারের রায় যখন ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী আসন নেয়, তখন তার আইনি নিরেটতা এবং পদ্ধতিগত স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকার অবকাশ থাকা উচিত নয়। বিশেষ করে, যখন কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটার কয়েক দশক পর তার বিচার শুরু হয়, তখন সবচেয়ে বড় যে সংকটের মুখোমুখি হতে হয়, তা হলো—"সাক্ষীদের স্মৃতির নির্ভরযোগ্যতা।"মনোবিজ্ঞানের একটি চিরন্তন সত্য হলো, মানুষের স্মৃতি কোনো অপরিবর্তনীয় ডিজিটাল রেকর্ড নয়। সময়, পারিপার্শ্বিক চাপ, সামাজিক আলোচনা এবং দীর্ঘদিনের ক্ষত মানুষের স্মৃতিকে ক্রমাগত প্রভাবিত করে। কয়েক দশক আগের একটি ঘটনা যখন একজন সাধারণ মানুষ আজ আদালতে দাঁড়িয়ে বর্ণনা করেন, তখন অবচেতনভাবেই তাতে নতুন অনেক উপাদান যুক্ত হতে পারে, আবার অনেক গুরুত্বপূর্ণ সত্য হারিয়েও যেতে পারে। আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার সংক্রান্ত বৈশ্বিক নজিরগুলোর দিকে তাকালে এই স্মৃতির বিবর্তনের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।এই প্রসঙ্গে ১৯৯৯ সালে পূর্ব তিমুরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (Hybrid Tribunal) বিখ্যাত "তাকাকি মামলা" (The Prosecutor v. Joao Fernandes / Takaki Case)-র কথা বিস্তারিতভাবে স্মরণ করা যায়। ১৯৯৯ সালে পূর্ব তিমুরে ইন্দোনেশিয়ার শাসন থেকে স্বাধীনতার লক্ষ্যে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটের পর ইন্দোনেশীয়পন্থী সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনী এবং ইন্দোনেশীয় সামরিক জান্তা সেখানে ব্যাপক গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও নির্যাতন চালায়। এই ঘটনার বিচারের জন্য ২০০০ সালে জাতিসংঘ এবং পূর্ব তিমুর সরকারের যৌথ উদ্যোগে 'Special Panels for Serious Crimes' নামক একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।এই ট্রাইব্যুনালেই উত্থাপিত হয়েছিল 'তাকাকি মামলা'। ঘটনার বেশ কয়েক বছর পর যখন এই বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন ফরেনসিক প্রমাণ এবং পূর্বতন নথির সাথে আদালতের কাঠগড়ায় দেওয়া প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের জবানবন্দির মধ্যে ব্যাপক বৈপরীত্য বা অসঙ্গতি দেখা গিয়েছিল। আদালতের নথিতে দেখা যায়, ঘটনার পরপরই অর্থাৎ ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার কর্মীদের কাছে বা প্রাথমিক তদন্তে সাক্ষীরা ঘটনার যে বিবরণ এবং অপরাধীদের যে হুলিয়া দিয়েছিলেন, ট্রাইবুনাল-এর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দেওয়া বিবরণের সাথে তা মিলছিল না। এমনকি ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের উদ্ধার করা মরদেহের আঘাতের চিহ্ন, অস্ত্রের ধরন এবং হত্যাকাণ্ডের স্থানিক দূরত্বের সাথে সাক্ষীদের মৌখিক বর্ণনায় মারাত্মক তফাত ধরা পড়ে। আদালত তখন মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও সূক্ষ্ম জেরার আশ্রয় নেন। জেরার মুখে উন্মোচিত হয় যে, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার কারণে, নিজেদের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে আলাপ-আলোচনার ফলে এবং পরবর্তীতে গণমাধ্যমের নানা প্রতিবেদন দেখার কারণে সাক্ষীরা অবচেতনভাবেই তাদের স্মৃতি পুনর্গঠন (Reconstructive Memory) করে ফেলেছিলেন। অন্যের মুখে শোনা কথা বা পত্রিকার খবরকে তারা নিজেদের চোখে দেখা বাস্তব বলে বিশ্বাস করা শুরু করেছিলেন। আদালত শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য হন যে, ঐতিহাসিক বিচারগুলোতে কেবল আবেগের ওপর ভিত্তি করে মৌখিক সাক্ষ্যকে পরম সত্য ধরে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ, যদি না তাকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে জেরা ও নথির মাধ্যমে যাচাই করা হয়।ঠিক একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও আইনি সংকট দেখা গেছে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (ICT) বেশ কিছু বিচার প্রক্রিয়াতেও। এর সবচেয়ে বড় এবং স্পষ্ট উদাহরণ হলো শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার "সোহাগপুর হত্যাকাণ্ড", যা আজ ইতিহাসে "বিধবাপল্লী" নামে পরিচিত। ১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগী আল-বদর ও রাজাকার বাহিনী সোহাগপুর গ্রামে হানা দিয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ১৮৭ জন নিরীহ পুরুষ মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। ঘটনার পর পুরো গ্রামে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ বেঁচে ছিলেন না। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৩৯ বছর পর, ২০১০ সালে যখন বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়, তখন জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ৩ নম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগে এই সোহাগপুর গণহত্যার দায় আনা হয়।এই মামলার বিচারিক কার্যক্রমে স্মৃতির বিবর্তন এবং আইনি জেরার গুরুত্বের বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে सामने আসে। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ চার দশক ধরে সোহাগপুরের বেঁচে যাওয়া বীরাঙ্গনা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বিভিন্ন গবেষক, গণমাধ্যম, প্রামাণ্যচিত্র এবং মানবাধিকার কর্মীদের কাছে ঘটনার যে বিবরণ দিয়েছিলেন, তার লিখিত ও ভিডিও রেকর্ড ছিল। সেই প্রথমদিকের বিবরণীগুলোতে স্থানীয় রাজাকার কাদির ডাক্তার, নসা, ফসি চেয়ারম্যান বা নাজির মাস্টারের নাম মূল অপরাধী ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে বারবার এসেছিল। কিন্তু বহু বছর পর হঠাৎ ট্রাইব্যুনালের আনুষ্ঠানিক জবানবন্দিতে কামারুজ্জামানকে সরাসরি সেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে ব্রাশফায়ারের নির্দেশ দাতা বা মূল খলনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দেখান যে, তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে বা বহু বছর আগের কাগজপত্রে যেখানে মূল আসামির নাম বা সরাসরি সংশ্লিষ্টতা অনুপস্থিত ছিল, কয়েক দশক পর হঠাৎ স্মৃতির ওপর ভর করে তাকে মূল চরিত্রে নিয়ে আসাটা আইনি পরিভাষায় "স্মৃতির বিবর্তন" বা "স্মৃতি পুনর্গঠন"। আসামিপক্ষের দাবি ছিল, দীর্ঘ ৪২ বছর পর সাক্ষীদের এই জবানবন্দির ভেতরের অসঙ্গতি প্রমাণ করতে তাদের যে ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে এবং নিবিড় জেরার (Cross-examination) সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন ছিল, আইনি ও পদ্ধতিগত কঠোরতার কারণে তা সীমিত ছিল। যদিও ট্রাইব্যুনাল এবং পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ট্রমা বিবেচনা করে কামারুজ্জামানকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন এবং ২০১৫ সালে তা কার্যকর হয়; কিন্তু এই মামলার আইনি বিতর্কটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পদ্ধতিগত স্বচ্ছতার প্রশ্নে বারবার আলোচিত হয়েছে।আর ঠিক এই জায়গাতেই প্রয়োজন হয় একটি শক্তিশালী, নিরপেক্ষ এবং বাধাহীন 'জেরা' প্রক্রিয়ার। সাক্ষীদের পূর্বতন অসঙ্গতিপূর্ণ জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে জেরা করা বিবাদী পক্ষের জন্য কেবল একটি সাধারণ আইনি অধিকার নয়, বরং তা সত্য উদ্ঘাটনের অন্যতম প্রধান ঢাল। যদি কোনো বিচার প্রক্রিয়ায় আইনি সীমাবদ্ধতা বা পদ্ধতিগত কঠোরতার কারণে বিবাদী পক্ষকে এই জেরার পূর্ণ সুযোগ দেওয়া না হয়, তবে পুরো প্রক্রিয়াটির নির্ভরযোগ্যতা দুর্বল হয়ে পড়ে। পূর্ববর্তী জবানবন্দির সাথে আদালতের বক্তব্যের স্পষ্ট অমিল থাকা সত্ত্বেও যদি তাকে পূর্বতন নথির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে যথাযথভাবে যাচাই করা সম্ভব না হয়, তবে অনেক ক্ষেত্রে এমন সাক্ষ্যও গ্রহণ করে নেওয়া হতে পারে যা শতভাগ নিরেট নয়। এর ফলে দিনশেষে যে রায় বা দণ্ডাদেশ আসে, তা ঐতিহাসিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। অনেক সময় দেখা যায়, তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে যে তথ্যের উল্লেখ ছিল না, বহু বছর পর আদালতে এসে সেই তথ্যে বিশাল রদবদল ঘটে। আইন ও বিচারের মূল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর নিখুঁত নিরপেক্ষতায়। স্মৃতির এই স্বাভাবিক ক্ষয় বা পরিবর্তনকে যদি আদালতের কাঠগড়ায় বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টिकोণ থেকে বিচার না করে, কেবল সময়ের ব্যবধানের দোহাই দিয়ে আড়াল করা হয়, তবে তা বিচারিক ন্যায়বিচারের নীতিকে ক্ষুণ্ণ করে। একটি সুস্থ ও সভ্য সমাজে যেকোনো অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, ঠিক তেমনি সেই বিচারে অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের এবং সত্যকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করার সুযোগ দেওয়াও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। স্মৃতির গোলকধাঁধায় যেন ন্যায়বিচার হারিয়ে না যায়, এবং আইনি প্রক্রিয়ার কোনো ফাঁকফোকর যেন একটি ঐতিহাসিক বিচারকে ভবিষ্যতের কাঠগড়ায় দাঁড় না করায়—সেদিকে নজর রাখা দেশের বিচার ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলেরই অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
লেখক: মো:আশরাফুল আলম
সহকারী প্রধান শিক্ষক,টবগী মাধ্যমিক বিদ্যালয়,ভোলা