"রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল আজও কেন প্রাসঙ্গিক"
//মো. আশরাফুল আলম//
বাংলা ভাষার ইতিহাসে এমন দুটি নাম আছে, যাদের ছাড়া আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি, এমনকি জাতিসত্তার কথাও পূর্ণতা পায় না। একজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অন্যজন কাজী নজরুল ইসলাম। একজনের হাতে বাংলা ভাষা পেয়েছে সৌন্দর্যের রাজমুকুট, অন্যজনের কণ্ঠে পেয়েছে প্রতিবাদের বজ্রধ্বনি।আজকের দিনে যখন সমাজে অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, মানুষ মানুষকে ধর্ম, মত, দল কিংবা পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভক্ত করছে, তখন বারবার ফিরে তাকাতে হয় এই দুই মহামানবের দিকে। কারণ তাঁরা শুধু কবি ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন সময়ের শিক্ষক, সমাজের বিবেক এবং মানুষের মুক্তির পথপ্রদর্শক।রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়লে মনে হয়, পৃথিবী যেন একটু বেশি সুন্দর। গাছের পাতার মর্মর ধ্বনি, বর্ষার বৃষ্টিধারা, গ্রামের পথ, নদীর ঢেউ কিংবা মানুষের ভালোবাসা—সবকিছু তাঁর শব্দে নতুন জীবন পায়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন সৌন্দর্যকে অনুভব করতে, মানুষকে ভালোবাসতে এবং পৃথিবীকে আপন করে নিতে।অন্যদিকে নজরুলের কবিতা পড়লে মনে হয় বুকের ভেতর সাহসের আগুন জ্বলে উঠছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি, শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সাম্যের ডাক এবং মানবমুক্তির স্বপ্ন তাঁর রচনার মূল সুর।কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাঁদের সৃষ্টি শত বছর পরেও পুরোনো হয়নি। বরং সময় যত এগোচ্ছে, তাঁদের প্রয়োজন ততই বাড়ছে।একটু চারপাশে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়।আজ আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামান্য মতভেদের কারণেও মানুষ একে অপরকে আক্রমণ করছে। ধর্ম নিয়ে বিভাজন, রাজনৈতিক বিদ্বেষ, ব্যক্তিগত শত্রুতা—সবকিছু যেন ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এই সময়ে নজরুলের সেই মানবতার আহ্বান নতুন করে মনে পড়ে—
"গাহি সাম্যের গান—
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।"
নজরুল তাঁর কলম দিয়ে বুঝিয়েছিলেন, মানুষের পরিচয়ের আগে মানুষ হওয়াটাই সবচেয়ে বড় পরিচয়।সম্প্রতি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ, সংঘাত ও সহিংসতার ঘটনা আমাদের চোখের সামনে ঘটছে। হাজার হাজার নিরীহ মানুষ ঘর হারাচ্ছে, শিশু হারাচ্ছে তাদের শৈশব। এমন পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবতার দর্শন যেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের চেয়ে মানবতার জয়কে বড় করে দেখেছিলেন।আবার আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকেও যদি তাকাই, দেখতে পাই পরীক্ষার ফলাফল ও সনদের প্রতিযোগিতায় আমরা অনেক সময় মানবিক শিক্ষা হারিয়ে ফেলছি। শিশুরা নম্বর অর্জন শিখছে, কিন্তু সহমর্মিতা, সততা ও মূল্যবোধ শেখার সুযোগ কমে যাচ্ছে।এই জায়গায় রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শ আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা মানে কেবল তথ্য মুখস্থ করা নয়; শিক্ষা মানে মানুষ হওয়া।কয়েক বছর আগে দেশের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক শিক্ষক নিজের অর্থ দিয়ে বিদ্যালয়ে গাছ লাগিয়েছিলেন, শিক্ষার্থীদের বই কিনে দিয়েছিলেন। কোনো প্রচার ছিল না, কোনো সংবাদ সম্মেলনও ছিল না। কিন্তু তিনি জানতেন, মানুষ গড়াই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। এই চেতনার মধ্যেই যেন রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা-ভাবনা জীবন্ত হয়ে আছে।অন্যদিকে আমরা প্রায়ই দেখি, কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে ভয় পায়। চাকরি হারানোর ভয়, সামাজিক চাপে পড়ার ভয় কিংবা নানা ধরনের অনিশ্চয়তা মানুষকে নীরব করে দেয়।কিন্তু ইতিহাস বলে, নীরবতা কখনো অন্যায়কে থামাতে পারে না।বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা গণতন্ত্রের বিভিন্ন আন্দোলনে যারা সাহস করে রাস্তায় নেমেছিলেন, তাঁদের হৃদয়ে কমবেশি নজরুলের সেই বিদ্রোহী চেতনা কাজ করেছে। কারণ নজরুল শিখিয়েছেন—মাথা নত করে বেঁচে থাকার চেয়ে সত্যের জন্য দাঁড়ানো শ্রেয়।আজকের তরুণ সমাজের মধ্যেও এই দুই কবির উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। কেউ হয়তো পরীক্ষার চাপ, ব্যর্থতা কিংবা জীবনের হতাশায় ভেঙে পড়ছে। তখন রবীন্দ্রনাথের গান তাকে আশার আলো দেখায়। আবার কেউ সমাজের অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে চায়; তখন নজরুল তাকে সাহস জোগান।একজন শান্তির কবি, অন্যজন সংগ্রামের কবি—কিন্তু দুজনেই মানুষের কবি।আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তগুলোতেও তাঁদের উপস্থিতি অনিবার্য। জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক আয়োজন, বিদ্যালয়ের বার্ষিক অনুষ্ঠান কিংবা কোনো সামাজিক উৎসব—সবখানেই রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুলসংগীত সমানভাবে উচ্চারিত হয়।এটি কেবল সাহিত্যিক জনপ্রিয়তা নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের অংশ।দুঃখজনকভাবে আজকের অনেক তরুণ-তরুণী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষণস্থায়ী বিনোদনের ভিড়ে ধীরে ধীরে বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। অথচ রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে না পড়লে আমরা নিজেদের শিকড়কেই অস্বীকার করি। কারণ তাঁদের সাহিত্য কেবল শব্দের অলংকার নয়; সেখানে আছে জীবনবোধ, নৈতিকতা, মানবতা ও আত্মমর্যাদার শিক্ষা।রবীন্দ্রনাথ আমাদের শেখান—পৃথিবীকে ভালোবাসতে।নজরুল আমাদের শেখান—অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করতে।রবীন্দ্রনাথ বলেন, মানুষকে হৃদয় দিয়ে দেখতে।নজরুল বলেন, মানুষকে তার মর্যাদা দিয়ে বিচার করতে।একজন আমাদের হাতে তুলে দেন সৌন্দর্যের প্রদীপ, অন্যজন সাহসের মশাল।বাংলা ভাষার আকাশে তাই তাঁরা দুটি উজ্জ্বল নক্ষত্র নন, তাঁরা দুটি দিকনির্দেশনা। যখন সমাজ অন্ধকারে পথ হারায়, তখন রবীন্দ্রনাথ দেখান আলোর পথ। যখন মানুষ অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে চায়, তখন নজরুল শেখান মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে। সময়ের স্রোত বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে, প্রজন্ম বদলাবে; কিন্তু বাঙালির হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথের স্নিগ্ধতা এবং নজরুলের দীপ্ত রৌদ্রতাপ চিরকাল সমানভাবে জ্বলজ্বল করবে।কারণ তাঁরা কেবল দুই কবি নন—তাঁরা আমাদের বিবেক, আমাদের চেতনা এবং আমাদের আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।