"ভোগবাদ ও ভূ-রাজনীতির সংকটে, হজ্ব-কুরবানির চিরন্তন শিক্ষা"
//মো: আশরাফুল আলম //
আজকের বিশ্ব এক চরম মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও কৃত্রিম ভূ-রাজনৈতিক সীমানার জাঁতাকল, অন্যদিকে করপোরেট পুঁজিবাদের চরম ভোগবাদী আগ্রাসন—মানুষকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন, ব্যক্তিকেন্দ্রীক ও অবদমিত হিংস্রতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত, এই বৈশ্বিক বাস্তবতায় ইসলামের মহান বিধানগুলোকে প্রায়শই কেবল ‘ব্যক্তিগত, আধ্যাত্মিকতা’বা ‘নির্জীব প্রথাগত আচার’-এর ফ্রেমে বন্দি করার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু ইসলামি শরিয়তের দুটি অন্যতম প্রধান স্তম্ভ—হজ্ব ও কুরবানি কেবল নির্ধারিত কিছু শারীরিক ও আর্থিক রীতির সমষ্টি নয়; বরং এটি মুসলিম উম্মাহর সামষ্টি পুনর্জাগরণ,আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক ঐক্য এবং নৈতিক বিপ্লবের এক অনন্য বার্ষিক পাঠশালা। এটি মূলত উম্মাহর হারানো গৌরব ও আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারের একটি আন্তর্জাতিক ঘোষণাপত্র।
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে কাঁটাতারের বেড়া এবং পাসপোর্টের বেড়াজালে মানবজাতিকে টুকরো টুকরো করে বিভক্ত করে রেখেছে, সেখানে হজ্ব এক অখণ্ড বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের জানান দেয়। শরিয়তের পরিভাষায় নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত নিয়মে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পবিত্র কাবা, আরাফাত, মিনা ও মুজদালিফায় অবস্থানসহ সুনির্দিষ্ট কার্যাদি সম্পাদনই হলো হজ্ব। মহান আল্লাহ সামর্থ্যবানদের ওপর জীবনে একবার এটি ফরজ করে বলেছেন, “আর আল্লাহর উদ্দেশ্যে এ গৃহের হজ করা মানুষের ওপর ফরজ, যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য রয়েছে।” (সূরা আলে عمران: ৯৭)।হজ্বের সবচেয়ে বড় বৈপ্লবিক শিক্ষা হলো—এটি মুসলিম উম্মাহর মাঝে এক পরম ও অবিভাজ্য ঐক্যের ভিত্তি গড়ে তোলে। আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা ম্যালকম এক্স ১৯৬৪ সালে মক্কায় হজ্ব পালন করতে গিয়ে বর্ণবাদের এক অলৌকিক ও বাস্তব সমাধান খুঁজে পেয়েছিলেন। তিনি তাঁর ডায়েরিতেলিখেছিলেন— “আমেরিকায় আমি যে তীব্র বর্ণবাদ ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ দেখেছি, মক্কায় এসে তা কর্পূরের মতো উড়ে যেতে দেখলাম। এখানে নীল চোখের শ্বেতাঙ্গ আর আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গ একই পোশাকে, একই পাত্রে খাচ্ছে, একই রবের উপাসনা করছে।” লাখো মানুষের সমস্বরে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনি কৃত্রিম জাতীয়তাবাদের অহংকারকে চূর্ণ করে দেয়। ইহরামের শুভ্র ও সেলাইহীন পোশাকে ধনী-গরিব, শাসক-শাসিত যখন একাকার হয়ে যায়, তখন সেখানে পোশাকী আভিজাত্য বা কর্পোরেট দাসত্বের কোনো চিহ্ন থাকে না। বিদায় হজ্বের ঐতিহাসিক ভাষণে রাসূলুল্লাহ (সা:) পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন, “আরবীর ওপর অনারবীর, কিংবা কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মানদণ্ড হলো তাকওয়া বা খোদাভীতি।” (মুসনাদে আহমাদ)। আজকের বিভক্ত মুসলিম বিশ্বের জন্য হজ্ব মূলত একটি ‘বৈশ্বিক থিঙ্ক-ট্যাংক’ গঠনের তাগিদ দেয়, যেখানে উম্মাহর সংকটগুলোর সম্মিলিত ও স্বাধীন ভূ-রাজনৈতিক সমাধান খোঁজা সম্ভব।জিলহজ্ব মাসের দ্বিতীয় প্রধান অনুষঙ্গ হলো কুরবানি। এটি কেবল নির্দিষ্ট পশুর গলায় ছুরি চালানো নয়; বরং মানুষের ভেতরের ‘পশুত্ব’ এবং আধুনিক করপোরেট সংস্কৃতির শেখানো ‘চরম ভোগবাদী মানসিকতা’কে আল্লাহর রাস্তায় জবেহ করার এক মহান মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক সংগ্রাম। এটি মিল্লাতের পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর সেই কালজয়ী ঐতিহাসিক ত্যাগের স্মারক, যেখানে আল্লাহর সুনির্দিষ্ট নির্দেশের সামনে পার্থিব কোনো মহব্বত, মোহ বা ব্যক্তিগত স্বার্থের বিন্দুমাত্র স্থান ছিল না।আজকের যুগে মানুষ যখন নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থে সমাজ, দেশ বা মানবতাকে ধ্বংস করতে দ্বিধা করে না, তখন কুরবানি আমাদের শেখায় নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। পিতা যখন তাঁর কিশোর পুত্রকে ওহীর স্বপ্নের কথা জানালেন, তখন ইসমাইল (আ.) কোনো বাঁচার আকুতি জানাননি, বরং বলেছিলেন, “হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তা-ই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।” (সূরা আস-সাফফাত: ১০২)। আল্লাহর বাণী—“আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।” (সূরা হজ্ব: ৩৭)।সামাজিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কুরবানি হলো পুঁজিবাদী শোষণের বিপরীতে এক বৈপ্লবিক সুষম বণ্টন ব্যবস্থার মডেল। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় সম্পদ যখন গুটিকয়েক ধনকুবেরের হাতে কুক্ষিগত, তখন কুরবানির মাংস তিন ভাগে ভাগ করে দরিদ্র ও আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার বিধান সমাজের প্রান্তিক মানুষের মুখে হাসি ফোটায়। ইসলামের মূল দর্শনই হলো—“যাতে সম্পদ কেবল ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।” (সূরা হাশর: ৭)। পশুপালন, চামড়া শিল্প ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণকে কেন্দ্র করে এই মৌসুমে যে বিশাল অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক লেনদেন হয়, তা মূলত তৃণমূল অর্থনীতির চাকাকে সচল করে। এই দানশীলতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারলে মুসলিম বিশ্ব থেকে দারিদ্র্য চিরতরে দূর করা সম্ভব।একইভাবে, হজ্ব ও কুরবানির প্রতিটি রুকন আমাদের বাস্তব জীবনের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী সামাজিক ও শৃঙ্খলাগত প্রশিক্ষণ। তীব্র ভিড় ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মাঝে নির্দিষ্ট নিয়মে ইহরাম বাঁধা, আরাফায় অবস্থান, খোলা আকাশের নিচে মুজদালিফায় রাত যাপন এবং মিনায় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ—এই পুরো প্রক্রিয়াটি হাজীদের মাঝে চরম ধৈর্য ও নিখুঁত শৃঙ্খলা তৈরি করে। লক্ষ লক্ষ মানুষের এই বিশাল জনসমুদ্র যেভাবে একজন আমীরের (পরিচালক) নির্দেশনায় এবং শরিয়তের বেঁধে দেওয়া সুনির্দিষ্ট সময়ের ফ্রেমে অবলীলায় ওঠাবসা করে, তা উম্মাহকে একটি সুসংগঠিত সামরিক বাহিনীর মতো প্রশিক্ষণ দেয়। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন, যারা তাঁর পথে সারিবদ্ধভাবে লড়াই করে, যেন তারা এক সীসাঢালা প্রাচীর।” (সূরা আস-সাফ: ৪)। হজ্ব ও কুরবানি কোনো বার্ষিক উৎসব বা নিছক আচারের নাম নয়। এটি আল্লাহর দেখানো এমন এক শিক্ষালয়, যা মুসলিম উম্মাহকে জাগতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব থেকে মুক্ত করে এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত করতে পারে। সমকালীন বিশ্বরাজনীতি ও সমাজতত্ত্বের আলোকে এই ইবাদতদ্বয়ের অন্তর্নিহিত দর্শনকে বোঝা এবং তা ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে প্রয়োগ করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। তবেই উম্মাহ তার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করতে পারবে এবং বিশ্বমানবতার সামনে সামাজিক ইনসাফ ও শান্তির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।