"মানবিক মূল্যবোধের বিচ্যুতি: আমাদের নৈতিক পতনের শেষ কোথায়?"
মো: আশররাফুল আলম
সবুজ গাছপালা আর পাখির কলকাকলিতে ঘেরা যে সমাজকে আমরা একসময় ‘সোনার বাংলা’ বলে গর্ব করতাম, আজ যেন সেখানে এক অদৃশ্য পচন ধরেছে। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নির্মমতা, হিংস্রতা আর পাশবিকতার গল্প। কোথাও অবুঝ শিশুর কান্না, কোথাও নারীর আর্তনাদ, আবার কোথাও সামান্য স্বার্থের জন্য পিটিয়ে মানুষ হত্যার মহোৎসব। এই নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজ প্রতিটি विवेकবান মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন জাগে—আমাদের মানবিক মূল্যবোধ আর কত নিচে নামবে?
আমাদের দেশে ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবগুলো আসে মানুষের মনের ভেতরের হিংসা, বিদ্বেষ আর অহংকারকে পুড়িয়ে ছাই করতে। ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়াবে—এটাই হওয়ার কথা ছিল স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি বড়ই অদ্ভুত এবং বেদনাদায়ক। একদিকে যখন একদল মানুষ উৎসবের আমেজে মেতে উঠছে, ঠিক তখনই অন্যদিকে কোনো এক কোণে চলছে নির্মম ক্ষমতার লড়াই, দখলদারিত্ব কিংবা কোনো নিরীহ প্রাণ কেড়ে নেওয়ার নিষ্ঠুর উল্লাস। পশু কোরবানি বা উৎসবের বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা যতটুকু গুরুত্ব পাচ্ছে, মানুষের ভেতরের ‘পশুত্ব’ দমনে আমরা ততটুকুই ব্যর্থ হচ্ছি। ফলে উৎসব শেষ হতে না হতেই সমাজ আবার ফিরে যাচ্ছে সেই চেনা অস্থিরতা আর অরাজকতায়।
একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক বিকাশের ওপর। কিন্তু বর্তমান সমাজে সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত আমাদের এই নিষ্পাপ শিশুরা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে ঘটে যাওয়া কিছু লোমহর্ষক শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। যে শিশুটির থাকার কথা ছিল খেলার মাঠে কিংবা স্কুলের বারান্দায়, সে আজ ঘরের ভেতরেও এক তীব্র আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ধর্ষণ, অপহরণ আর খুনের মতো জঘন্য অপরাধের শিকার হচ্ছে শিশুরা। সবচেয়ে ভীতিপ্রদ বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে চেনা মানুষ বা প্রতিবেশীর দ্বারাই এই অপরাধগুলো সংঘটিত হচ্ছে। এই ধরনের পাশবিকতা শুধু একটি পরিবারকে ধ্বংস করে না, বরং পুরো সামাজিক কাঠামো এবং বিশ্বাসের ভিতকে নাড়িয়ে দেয়। মা-বাবারা আজ তাদের সন্তানদের বাইরে পাঠাতে ভয় পান। এই মানসিক ট্রমা ও আতঙ্ক নতুন প্রজন্মকে এক অন্ধকার ও সন্দিহান ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আইনের শাসন যেখানে দুর্বল, অপরাধ সেখানে ডালপালা মেলে—এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। সমাজে যখন একের পর এক নৃশংস ঘটনা ঘটে এবং অপরাধীরা রাজনৈতিক বা ক্ষমতার প্রভাবে পার পেয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষের মনে এক তীব্র হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম নেয়। আইন ও বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে অনেক সময় সাধারণ মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বাধ্য হয়। গণপিটুনি বা উত্তেজিত জনতার থানা ঘেরাওয়ের মতো ঘটনাগুলো আসলে বিচারহীনতার সংস্কৃতিরই এক চরম বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু ক্ষোভের বশে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, বরং এটি সমাজকে আরও বেশি অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যায়।
এই অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকে বের হওয়ার রাস্তা কোথায়? শুধু আইন প্রয়োগ বা কঠোর শাস্তি দিয়ে অপরাধের চিরতরে অবসান ঘটানো সম্ভব নয়, যদি না মানুষের ভেতরের নৈতিকতার পরিবর্তন হয়। এর জন্য সবার আগে প্রয়োজন পারিবারিক শিক্ষা। প্রতিটি পরিবারে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহানুভূতি এবং মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে। সেই সাথে গড়ে তুলতে হবে সামাজিক প্রতিরোধ; অপরাধী যেই হোক না কেন, তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় না দিয়ে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। রাষ্ট্রকেও অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত এবং স্বল্পতম সময়ে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অপরাধীরা সমাজ ও আইনকে ভয় পায়। পাশাপাশি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়ে এর ভেতরের নৈতিক শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধির ওপর জোর দেওয়া জরুরি।আমরা যদি আজই এই মানবিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়াই, তবে আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা এমন এক সমাজ রেখে যাব, যা হবে সম্পূর্ণ বসবাসের অযোগ্য। আসুন, ক্ষমতার অহংকার আর স্বার্থপরতা ভুলে মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়াই। নিজের ভেতরের মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তুলি। কারণ, মানুষ যদি তার মানবিকতা হারায়, তবে তার আর কোনো অস্তিত্বই অবশিষ্ট থাকে না।