বাংলাদেশের গণতন্ত্র আজ কোথায়?- সিইও, জাকির হোসেন

ভোলার খবর নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে গণতন্ত্র নিয়ে যত আলোচনা, তত বিতর্ক। কিন্তু ২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সময়কাল—এই ১৬ বছর দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সবচেয়ে জটিল ও প্রশ্নবিদ্ধ অধ্যায়। এই সময়ের প্রতিটি জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে পর্যবেক্ষণ সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে অগ্রদূত সংস্থা (এএস) এনজিও, যার আমি ছিলাম প্রধান। নির্বাচনের মাঠে গিয়ে দেখা ও শোনা অভিজ্ঞতা থেকে আমি একটি কঠিন সত্য উপলব্ধি করেছি— বাংলাদেশে গণতন্ত্র এখন একটি রাজনৈতিক স্লোগান, বাস্তবতা নয়।
২০০৮ সালের নির্বাচন ছিল পুনরুদ্ধারের আশা, কিন্তু শিকড়হীন গণতন্ত্র- ২০০৮ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল জরুরি সরকারের দুই বছরের শাসনকাল শেষে। তখন জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিল। নির্বাচনটি তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক হলেও এর পর থেকেই শুরু হয় দলীয়করণের পুনরুত্থান। আমরা মাঠপর্যায়ে দেখেছি—প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নির্বাচনের পরপরই পুনরায় নিজেদের দলীয় অবস্থান দৃঢ় করতে শুরু করে। সেই শুরু থেকেই গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
২০০৮ সালে জনগণ বিশ্বাস করেছিল যে তাদের ভোটই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, ক্ষমতার রাজনীতিই দেশের নীতি ও প্রশাসন নির্ধারণ করছে, জনগণের ভোট নয়। ২০১৪ সালে অংশগ্রহণহীন নির্বাচনের যাত্রা শুরু। ২০১৪ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রে এক মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত। বিএনপি ও এর নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচনে অংশ নেয়নি—নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি পূরণ না হওয়ায়। ফলাফল, দেশের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে কোনো ভোটই হয়নি।
আমাদের পর্যবেক্ষক দল ভোটের দিন এক ভয়াবহ নীরবতা প্রত্যক্ষ করেছে। ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটার ছিল হাতে গোনা, নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি ছিল প্রবল। গ্রামীণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে যেখানে সাধারণত উৎসবমুখর পরিবেশ থাকে, সেখানে ছিল নিস্তব্ধতা ও শঙ্কা। অনেক ভোটার আমাদের পর্যবেক্ষকদের বলেছেন: আমরা ভোট দিতে আসিনি, কারণ জানি ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত। এই নির্বাচন গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এবং এখান থেকেই শুরু হয় “গণতন্ত্রের নামে নিয়ন্ত্রিত রাজনীতির” এক নতুন অধ্যায়।
২০১৮ সালে ভোটের আগের রাতে গণতন্ত্রের মৃত্যু- ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় আমরা দেখেছি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কতটা গভীরে পৌঁছেছে। নির্বাচনের আগে থেকেই বিরোধী প্রার্থীদের ওপর হামলা, গ্রেফতার, মামলা ও প্রশাসনিক বাধা ছিল ব্যাপক। ভোটের আগের রাতেই অনেক এলাকায় ব্যালট ভর্তি, কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা এবং গণমাধ্যমের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের অভিযোগ উঠে আসে। আমাদের অগ্রদূত সংস্থা (এএস) এনজিওর ৩৯ জেলার পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদন ছিল অভিন্ন—“ভোট হচ্ছে, কিন্তু ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ নেই।”আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিতভাবে ১২ দফা সুপারিশ দাখিল করেছিলাম, যেখানে স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কমিশন সেই রিপোর্ট গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনকে অনেক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক “managed democracy” বা “নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র” বলে উল্লেখ করেছিলেন—যেখানে নির্বাচন হয়, কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে না। ২০২৪ সালে একদলীয় নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি- ২০২৪ সালের নির্বাচনও ২০১৪ সালের প্রায় পুনরাবৃত্তি। বিএনপি ও সমমনা দলগুলো আবারও নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল খুবই সীমিত, অনেক আসনে প্রার্থী ছিলেন কার্যত এককভাবে আওয়ামী লীগ বা তাদের শরিক দল। আমরা ভোটের দিন একাধিক কেন্দ্রে গিয়ে দেখেছি ভোটার উপস্থিতি ছিল কম, তরুণ ভোটারদের মধ্যে ছিল আগ্রহহীনতা ও হতাশা। একজন তরুণ ভোটার বলেছিলেন-“আমাদের ভোট দেই বা না দেই, ফলাফল আগেই লেখা।”এই মন্তব্যই প্রকাশ করে দেয়—গণতন্ত্রের মূল চেতনা, অর্থাৎ জনগণের অংশগ্রহণ, কতটা হারিয়ে গেছে। গণতন্ত্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে রাজনীতি
গণতন্ত্রের তিনটি মূল স্তম্ভ হলো- ১.জনগণের অংশগ্রহণ, ২.রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ৩.জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা। কিন্তু গত এক যুগে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই তিনটি উপাদানের কোনোটিই কার্যকর নেই।
জনগণ ভোট দিতে আগ্রহ হারিয়েছে, বিরোধী দলগুলো অংশ নিতে ভয় বা অনিচ্ছা প্রকাশ করছে,
প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন কার্যত সরকারের প্রভাবাধীন। এর ফলে নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা—যেখানে জনগণের ভূমিকা “দর্শক” এবং বিজয় আগেই নির্ধারিত। রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবনতি ও দলীয় স্বার্থ আমরা পর্যবেক্ষক হিসেবে দেখেছি—বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত ব্যক্তি ও দলকেন্দ্রিক, রাষ্ট্র বা জনগণকেন্দ্রিক নয়। ক্ষমতায় থাকা দল মনে করে রাষ্ট্র মানেই সরকার, আর সরকার মানেই দল।
অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোও ক্ষমতায় গেলে একই আচরণ করে। এভাবে প্রতিবার সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, এমনকি নির্বাচন কমিশনও দলীয় প্রভাবের আওতায় চলে আসে।
এই চক্রের ফলে গণতন্ত্র পরিণত হয়েছে কেবল ক্ষমতার পালাবদলের নাটকীয়তায়, যার মধ্যে জনগণের প্রকৃত স্বার্থ হারিয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশন: কাঠামো আছে, কিন্তু স্বাধীনতা নেই। আমরা প্রতিটি নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশনের কাছে পর্যবেক্ষণমূলক প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। তাতে প্রশাসনিক দুর্বলতা, কেন্দ্রীয় তদারকির অভাব এবং প্রযুক্তিগত অনিয়মের বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু কমিশন কখনও এই প্রতিবেদনগুলো জনসম্মুখে প্রকাশ করেনি, বরং উপেক্ষা করেছে। কমিশনের স্বাধীনতা এখন প্রশ্নবিদ্ধ—নিয়োগপ্রক্রিয়া থেকে শুরু করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যন্ত সব জায়গায় রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট।
যতদিন কমিশন সরকারের অধীনে থাকবে, ততদিন নির্বাচনকে “জনগণের উৎসব” বলা যাবে না।
জনগণের মনোভাব: নিরাশা, অনীহা ও অবিশ্বাস আমাদের অগ্রদূত সংস্থা (এএস) এনজিও নির্বাচনের আগে ও পরে হাজারো সাধারণ মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই মনে করেন, “নির্বাচন মানেই নাটক—ফলাফল আগে থেকে ঠিক।”এই মনোভাব রাজনীতির প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট করছে। তরুণ প্রজন্ম রাজনীতিকে দূষিত মনে করছে; তারা আর রাজনীতিকে পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দেখে না, বরং স্বার্থের লড়াই হিসেবে দেখে। আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা, কূটনৈতিক মহল ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলোও বারবার বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৪ সালের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক না পাঠিয়ে ইঙ্গিত দিয়েছে যে, নির্বাচন “অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক”নয়।এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্ব আস্থাকে দুর্বল করেছে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের বাস্তব পথ- বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমে প্রয়োজন রাজনৈতিক আস্থার পুনর্গঠন। এর জন্য জরুরি— ১.সব দলের অংশগ্রহণে আলোচনাভিত্তিক রাজনৈতিক চুক্তি, ২.নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, ৩.প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, ৪.নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের স্বাধীন ভূমিকা, ৫.তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক শিক্ষা ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধি।, যতক্ষণ পর্যন্ত নির্বাচন “ক্ষমতা রক্ষার উপায়” হিসেবে ব্যবহৃত হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত গণতন্ত্র থাকবে শুধু বক্তৃতায়, বাস্তবে নয়। অতপর- ২০০৮ থেকে ২০২৪—এই দীর্ঘ ১৬ বছরের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, বাংলাদেশে গণতন্ত্র এখন সংজ্ঞাহীন। প্রতিটি নির্বাচনের আগে “গণতন্ত্রের রক্ষা” নামে যে প্রতিশ্রুতি শোনা যায়, তা পরিণত হয় ক্ষমতার রক্ষায়।
নির্বাচন হয়, কিন্তু জনগণের অংশগ্রহণ নেই; জনপ্রতিনিধি হয়, কিন্তু জনগণের প্রতিনিধিত্ব নেই।
গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট নয়—মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা, জবাবদিহিমূলক শাসন এবং বিরোধী কণ্ঠের প্রতি সম্মান। আজ এসবই হারিয়ে গেছে দলীয়করণের অন্ধ প্রতিযোগিতায়। বাংলাদেশের গণতন্ত্র আজ দাঁড়িয়ে আছে এক কঠিন প্রশ্নের সামনে—“এই দেশের রাজনীতি কি জনগণের জন্য, নাকি কেবল ক্ষমতার জন্য?” গণতন্ত্র তখনই টিকে থাকে, যখন জনগণ তার মালিক হয়। আর আজ, জনগণ কেবল দর্শক।
লেখক: মো: জাকির হোসেন চৌধুরী, অগ্রদূত সংস্থা (এএস), (সাবেক নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা)।
